পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বড়াইগ্রামের তিরাইল

ভোরে পাখিদের কুহুতানে ঘুম ভাঙে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হয় তাদের উড়াউড়ি আর কিচিরমিচির শব্দ। তাদের উড়ে বেড়ানো আর মিষ্টিমধুর ডাক মুগ্ধ করে প্রকৃতি প্রেমীদের।

মন্তাজুর রহমান রানা, বড়াইগ্রাম (নাটোর)

Location :

Natore
পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল
পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল |নয়া দিগন্ত

পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে বড়াইগ্রামের তিরাইল গ্রাম। এটি এখন পাখিদের গ্রাম নামে পরিচিত। গ্রামের মানুষেরা এখানে পাখিদের শিকার না করে দিয়েছে নিরাপদ আশ্রয়। তাদের আতিথেয়তায় পাখিরাও যেন মুগ্ধ। তাই এক সময় শুধু শীতকালে এলেও এখন এখানেই স্থায়ী আবাস গড়েছে তারা। এ কারণে এ গ্রামে সারা বছরই দেখা মেলে এসব পরিযায়ী পাখিদের। দিনরাত পাখিদের কুহু-কলতানে মুখরিত হয়ে থাকে পুরো এলাকা।

রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাটোরের বড়াইগ্রামের তিরাইল বাজার সংলগ্ন প্রায় ১২ বিঘা জমির একটি বাঁশের ঝাড়সহ পাশের বিভিন্ন গাছের ডালে-ডালে বাসা বেঁধেছে এসব পাখিরা। বিপুল সংখ্যক পাখির সমারোহে পরিবেশ হয়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন। ভোর থেকেই বাঁশের ঝাড়ে পাখিদের কোলাহল-কলরব, ডানা মেলে অবাধ বিচরণ আর ঝাঁকে-ঝাঁকে উড়ে বেড়ানোর নান্দনিক দৃশ্য সবাইকে মুগ্ধ করছে। পরিযায়ী পাখির কলতানে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। খাদ্যের সন্ধানে শীত প্রধান দেশ সাইবেরিয়া থেকে এসব পাখি এসে আবাস গড়েছে এ গ্রামে। প্রতিদিন এসব পাখি দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।

স্থানীয় শিক্ষার্থী সিনথিয়া মুস্তারিন জানান, এখানে বক, সারস, বুনো হাঁস বালি হাঁস, পানকৌড়ি, শামুকখোল, হড়িয়াল, হাড়গিলাসহ বিভিন্ন পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। তবে শামুকখোল ও হাড়গিলা প্রজাতির পাখিই বেশি। এরা আশেপাশের বিভিন্ন বিলে ক্ষতিকর পোকা-মাকড় ও শামুক খেয়ে জীবনধারণ করে। দিনের আলোতে বিলজুড়ে এসব পাখিদের দলবদ্ধ বিচরণ মুগ্ধ করে যে কাউকে।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এসব পাখিরা আগে শীতের শুরুতে এসে গরমের শুরুতে চলে যেত। কিন্তু এলাকাবাসী কোনোভাবে বিরক্ত না করায় প্রায় এক যুগ যাবৎ পাখিগুলো এখানেই রয়ে গেছে। বাঁশ ঝাড়সহ অন্যান্য গাছের ডালে বাসা বেঁধে তারা ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়।’

তিরাইল এলাকার মাদরাসা শিক্ষক আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমরা কাউকে পাখি শিকার করতে দেই না। তবুও রাতের আঁধারে বাচ্চাসহ পাখি চুরি করে কেউ-কেউ। প্রশাসন দৃষ্টি দিলে এখানে পাখির অভয়াশ্রম করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।’

স্থানীয় উদ্যোক্তা শাকিল আহমেদ বলেন, ‘ভোরে পাখিদের কুহুতানে আমাদের ঘুম ভাঙে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হয় তাদের উড়াউড়ি আর কিচিরমিচির শব্দ। পাখিদের উড়ে বেড়ানো আর মিষ্টিমধুর ডাক মুগ্ধ করে প্রকৃতি প্রেমীদের।’

পাখি দেখতে আসা দর্শনার্থী সোহেল রানা বলেন, ‘ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশীয় জাতের পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিরাইলে অতিথি পাখির আগমণ এ এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। খবর পেয়ে পাখিগুলো দেখতে এসেছি, খুব ভাল লাগছে।’

রাজশাহী বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্য প্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘স্থানীয়রা পাখি রক্ষায় এগিয়ে এসেছে এটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমরা সেখানে সভা-সেমিনার করাসহ বিলবোর্ড লাগানোর মাধ্যমে আরো জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেব।’

ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য ও সৌন্দর্য্য রক্ষায় পাখিগুলোর অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। কেউ পাখি শিকার করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’