হাওরে ধান-খড় হারিয়ে নিঃস্ব কৃষক, এবার ধেয়ে আসছে বন্যা

‘ধান তো গেছে গেছেই, হাওরে কিছু খড় স্তূপ করে রাখছিলাম, বৃষ্টির পানিতে এইগুলোও ভেসে গেছে। সারা বছর আমাদের উপাস থাকতে হবে, গরুগুলোও না খেয়ে মরবে।’

মো: আল আমিন, কিশোরগঞ্জ

Location :

Kishoreganj
অষ্টগ্রামে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় করে পারে নিয়ে আসছেন কৃষক
অষ্টগ্রামে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় করে পারে নিয়ে আসছেন কৃষক |নয়া দিগন্ত

ক্ষেতের পাকা ধান তলিয়ে গেছে আগেই। কেটে আনা যেসব ধান মাড়াই করে খলায় (উন্মুক্ত মাঠ) রাখা হয়েছিল শুকানোর জন্য, সেগুলোতেও পানি উঠে গেছে। বাড়িতে রাখা ধানে চারা গজাচ্ছে। ভেসে গেছে জমিতে রাখা ধানের খড়। উঁচুতে স্তুপ করে রাখা খড় টানা বৃষ্টিতে পচে গেছে।

এ অবস্থায় শনিবার (২ মে) ভোররাত থেকে সারাদিন হাওরে ভারী থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভোগান্তি বেড়েছে হাওরের মানুষের।

আগামীকাল রোববারও (৩ মে) হাওরে ভারী থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। এছাড়া সোমবার (৪ মে) বজ্রঝড়ের সম্ভাবনাও আছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জের কালনি, মগরা ও ধনু-বৌলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ধেয়ে আসছে উজান থেকে পাহাড়ের ঢল। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা করছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার সারাদিন হাওরে ছিলেন কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান। তিনি জানান, বৃষ্টির পানিতে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, করিমগঞ্জ, নিকলী ও বাজিতপুরের হাওরে দুই হাজার ২৭৭ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে।

গত দু’ দিন থেকে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।

চোখের সামনে পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন কৃষকরা। অষ্টগ্রাম হাওর এলাকার কৃষক বরজু মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টি এইবার আগেই শুরু অইয়া (হয়ে) গেছে, আমার পাঁচ কানি (৩৫ শতাংশে ১ কানি) জমির ধান কাটতে পারছি না। সব পানির নিচে তল অইয়া (তলিয়ে) গেছে। চার কানি জমির ধান কাইট্টা (কেটে) খলায় (ফাঁকা মাঠ) রাখছিলাম, এইগুলোও পানিতে পইচা গেছে।’

একই এলাকার কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘ধান তো গেছে গেছেই, হাওরে কিছু খড় স্তূপ করে রাখছিলাম, বৃষ্টির পানিতে এইগুলোও ভেসে গেছে। সারা বছর আমাদের উপাস থাকতে হবে, গরুগুলোও না খেয়ে মরবে।’

অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের এক কৃষক জানান, সাধারণত বৈশাখের প্রথম সপ্তাহেই তারা বোরো ধান কেটে ফেলেন। কিন্তু এবার বৈশাখের শুরু থেকেই বৃষ্টি হওয়ায় জমি ভেজা থাকায় ধান পাকতে দেরি হয়। পরে ধান পাকলেও ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কৃষকেরা ধান কাটতে পারেননি। সেসব ধানই এখন পানির নিচে।

গত কয়েকদিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে শুধু কিশোরগঞ্জ নয়; হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেও বিস্তীর্ণ বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এ সময়ে হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান। পহেলা বৈশাখ থেকে বৈশাখের শেষ পর্যন্ত এই এক মাস হাওরে বোরো ধান কাটা হয়। কিন্তু এবার ভারী বৃষ্টির কারণে কৃষকরা ধান কাটতে পারেননি।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো: শাহীনুল ইসলাম জানান, কিশোরগঞ্জের হাওরে গতকাল পর্যন্ত ৫৬ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধানের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ জেলায় গতকাল পর্যন্ত বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নয় হাজার ৪৫ হেক্টর জমির বোরো ধান।

কিশোরগঞ্জ জেলায় শুক্রবার (১ মে) দুপুরে একটু রোদ উঠলেও শনিবার থেকে আবার বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। শনিবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত প্রবল বর্ষণ হয়েছে। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

অষ্টগ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান যখন বৃষ্টিতে ধান তলিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন, তখন জেলার নিকলী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার জানায়, কিশোরগঞ্জ জেলায় আগামীকাল রোববার বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। আগামী ১২০ ঘণ্টা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, তবে এর তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয় ওই আবহাওয়া অফিস।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টিপাতের প্রভাবে কিশোরগঞ্জ জেলার সব নদ-নদীর পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। অষ্টগ্রাম উপজেলায় কালনী নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। করিমগঞ্জের চামড়াবন্দর এলাকায় মগড়া নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার এবং ইটনায় ধনু-বৌলাই নদীর পানি পাঁচ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে হাওরের আরো কিছু জমি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, বৃষ্টিপাত না কমলে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় রূপ নিতে পারে।

অষ্টগ্রাম উপজেলার কৃষক আব্দুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘একে তো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে ধান, তার ওপর রোদের দেখা না পাওয়ায় কেউ ধান কাটলেও তা শুকানোর কোনো উপায় নেই। ফলে এখন ধান কাটছেন না কেউ।’

মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামের কৃষক হারুন মিয়া বলেন, ‘যেসব জমির ধান তল অইয়া (তলিয়ে) গেছে, এগুলোতে পানি কমলেও কাটন যাইতো না। শ্রমিক পাইয়াম (পাবো) কই? কাদা জমিতে হারভেস্টার মেশিন যায় না। এরপরেও এই ধান থাকলে কিছুই পাওয়া যাইত না। সব পইচা গেছে। ছয়-সাত দিন পানির নিচে ধান থাকলে কি আর ভালো থাকবো?’

কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামের কৃষক হাবিল মিয়াও বোরো ধান নিয়ে নিজের দুর্দশার কথা জানান। তিনি মোট ১১ কানি জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। বৃষ্টি শুরু হতেই তার আট কানি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। তিন কানি ক্ষেতের ধান কেটে মাড়াই করে খলায় রেখেছিলেন। খলায় পানি উঠে সেই ধানও তলিয়ে গেছে। হাওরে স্তূপ করে রাখা খড় পচে গেছে।

হতাশা প্রকাশ করে কৃষক হাবিল মিয়া বলেন, ‘যেগুলো পানির তলে গেছে (পানিতে তলিয়ে গেছে), চাইছিলাম কাইট্টা আনতে। কিন্তু লোক লাগাইয়া খরচ কুলাইতে পারি নাই।’

এ অবস্থায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সাত জেলায় প্রায় ১১ হাজার ধান শুকানোর যন্ত্র (ড্রায়ার) বরাদ্দ করেছে।

ইটনার ধনপুর হাওরের কৃষক হেমন্ত কুমার দাস বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড তাগাদা দিতেছে হাওরের ধান কাইট্টা ঘরে আনার লাগি। কিন্তু পানিতে কেমনে ধান কাটাম? আর কাটলেও শুকায়াম কেমনে— ভালো কইরা তো সূর্যই ওঠে না।’

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর বোরো আবাদের শুরু থেকেই তারা নানা সঙ্কটে ছিলেন। বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে, পর্যাপ্ত ডিজেলও পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি ব্রি-৮৮ ধানে মিশ্রণের অভিযোগও রয়েছে। বোরো ধান পাকার শুরুতে শিলাবৃষ্টি, এরপর কয়েক দফা অতিবৃষ্টি এবং সর্বশেষ ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চার দফায় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাদের।

মিঠামইন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো: ওবায়দুল ইসলাম খান অপু জানান, এবারের দুর্যোগের কারণে কৃষকদের চলার কষ্টের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে। কারণ ধানের সাথে রাখা হাজার হাজার খড়ের স্তূপ পচে গেছে।