দখলদারদের কবলে জামালপুর শহরের গবাখালী : সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা

জামালপুর শহরে জলাবদ্ধতা নিরশন, পরিবেশ ও শহরবাসীর কল্যাণের কথা চিন্তা করে ৬৫ বছর আগে খনন করা হয় গবাখাল। স্থানীয় ভাবে যেটি গবাখালী নামে পরিচিত।

খাদেমুল বাবুল, জামালপুর

Location :

Jamalpur
দখলদারদের কবলে জামালপুর শহরের গবাখালী : সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা
দখলদারদের কবলে জামালপুর শহরের গবাখালী : সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা |নয়া দিগন্ত

জামালপুর শহরে জলাবদ্ধতা নিরশন, পরিবেশ ও শহরবাসীর কল্যাণের কথা চিন্তা করে ৬৫ বছর আগে খনন করা হয় গবাখাল। স্থানীয় ভাবে যেটি গবাখালী নামে পরিচিত।

জানা যায়, জামালপুর শহরের জলাবদ্ধতা নিরশন, নিয়ন্ত্রণ, সহজতর কৃষি উৎপাদন এবং মৎস্য আহরণ ও প্রজজনের লক্ষ্যে ১৯৬০-৬১ সালের দিকে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩০ ফুট প্রস্থ খালটি খনন করা হয়। খালটি জামালপুর শহরের শেখেরভিটা থেকে মনিরাজপুর, ছুটগড়, সিংড়িবিল, পলিশা, ধোপাকুড়ি, নাকাটি ও দামেশ্বর হয়ে কেন্দুয়া কালবাড়ি বাজার সংলগ্ন ঝিনাই নদীর সাথে সংযোগ করা হয়।

তিরুথা গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মিয়ার উদ্দিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘৬২ সালে ভূমি রেকর্ডের এক থেকে দুই বছর আগে থেকে মহকুমা ও পৌরসভা এ খালটি খনন শুরু করে। আমি তখন ছোট। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। খাল খননের খবর শুনে আমরা সহপাঠীরা তা দেখতে গেছিলাম।’

পলিশা গ্রামের মান্নান মাস্টার বলেন, ‘আমাদের শৈশব থেকে দেখে আসছি খালটিতে স্বচ্ছ জলাধারা ছিলো। প্রচুর মাছ পাওয়া যেতে। বড়দের সাথে আমি নিজেও স্কুল জীবনে মাছ ধরেছি। (বোয়াল, শোল, গজার, বাইম, টেংরা, পুটি, টাকিসহ নানা জাতের দেশীয় মাছে পরিপূর্ণ ছিলো গবাখালী। কি স্বাদের মাছে ছিলো এ খালে।) আমরা অনেকেই সাঁতার শিখেছি এ খালে। আমাদের জলকেলীতে মেতে উঠা শৈশব এ প্রজন্মের কাছে কল্পনার বিষয় মাত্র।’

তিনি আরো বলেন, (‘আমরা তখন অনেক ছোট। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই খালটি খনন করা হয়। আমার বাপ-দাদার জমিও আছে এ খালে। সরকার আমাদের জমির বদলে টাকা দিছে। এটি আরওআর রেকর্ডভুক্ত।) খালটি এখন ময়লা-আবর্জনা ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে শহরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বেদখল হয়েছে। সে কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে হাটু বা কোমর পানিতে তলিয়ে যায় জামালপুর শহর।’

খালটি দ্রুত উদ্ধার ও পুনঃখনন জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় জেলেদের জীবিকার উৎস ছিলো এই খাল। খালের দুই পাশে শতশত একর কৃষি জমিতে সহজে সেচ দিয়ে স্বল্প খরচে কৃষিপণ্য উৎপাদন করতেন কৃষকরা। খালের দুই পাড়ের বাসিন্দারা এই খালকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখে এসেছে সুদীর্ঘকাল।

কথিত আছে এই খালটি খননের ফলে জামালপুর শহরে কোনদিন জলবদ্ধা হয়নি বলে জানান শহরবাসী।

স্থানীয়রা জানান, গত দুই দশক আগেও এ খালের পানি প্রবাহ ছিলো বাঁধাহীন। এ খালের জন্য ১৯৮৮ ও ৯৮ -এর ভায়বহ বন্যার সময়ও শহরের রাস্তাঘাটে পানি দেখা যায় নি।

কালের বিবর্তনে স্বার্থান্বেষী একটি মহলের লোভের শিকার হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ও জনকল্যাণ মূলক গবাখাল। এখন ভরাট আর অবৈধ দখলদের কবলে পড়ে স্রোতবাহী শহরবাসীর গবাখালীন অস্তিত্ব বিলীনের দ্বারপ্রান্তে। দুইপাড়ের অনেক স্থানেই এখন গড়ে উঠেছে বসতি। পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য নিরাপদ মনে করে অনেকেই খালের পাড়ে স্থাপন করেছে পায়খানা। গৃহস্থালী, ক্লিনিকেল বজ্র, পলিথিন, প্লাস্টিকসহ ক্ষতিকারক ও অপচনশীল বর্জ্য ফেলে খালের পানি দূষণ করা হয়েছে।

সর্বশেষ গবাখালীর বুকে শেষ পেরেক মেরেছে পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন একটি রঙিন কাগজের মিলের নির্মম আগ্রাসন। মিলের রাসায়নিক তরল পদার্থ নির্গমন করা হয় গবাখালের পানিতে।

এখন মাছ তো দূরের কথা খালের পানিতে কোন জলজপ্রাণিও খোঁজে পাওয়া যায় না।

খালটির সূচনা পথই আটকে দিয়েছে স্বার্থান্বেষী মহল। জামালপুর শহরের পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তরের পানি এ খাল দিয়েই ঝিনাই নদীতে পড়তো। এখন শীর্ণধারায় পানির সাথে বিষ নেমে আসে ঝিনাই নদীতে। যেকারণে নদী এখন মাছশূন্য হয়ে পড়েছে।

জামালপুর পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘খালটি পুনঃখনন ও দখল মুক্ত হলে ফিরে পাবে পরিবেশের হারানো স্মৃতি। শহরবাসী রক্ষা পাবে জলাবদ্ধতা থেকে।’

মৃতপ্রায় গবাখালী আবারো প্রাণ ফিরে পাবে, প্রবাহিত হবে স্বচ্ছ পানিধারা এটাই প্রত্যশা জামালপুর শহরবাসীর।