উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট ১০ ইঞ্চি, স্বপ্ন আকাশছোঁয়ার

উপহাসকে পেছনে ফেলে শিক্ষাযুদ্ধে জয়ী হতে চান হাইয়ুল

উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট ১০ ইঞ্চি। প্রথম দেখায় অনেকেই অবাক হয়ে তাকান, কেউ মুচকি হাসেন, কেউবা কৌতূহল মেটাতে প্রশ্ন করেন। একসময় এই আড়চোখে তাকানো আর বিদ্রূপই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু মানুষের দৃষ্টি নয়, নিজের স্বপ্নকেই বড় করে দেখেছেন মো: হাইয়ুল মিয়া।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
উপহাসকে পেছনে ফেলে শিক্ষাযুদ্ধে জয়ী হতে চান হাইয়ুল
উপহাসকে পেছনে ফেলে শিক্ষাযুদ্ধে জয়ী হতে চান হাইয়ুল |নয়া দিগন্ত

উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট ১০ ইঞ্চি। প্রথম দেখায় অনেকেই অবাক হয়ে তাকান, কেউ মুচকি হাসেন, কেউবা কৌতূহল মেটাতে প্রশ্ন করেন। একসময় এই আড়চোখে তাকানো আর বিদ্রূপই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু মানুষের দৃষ্টি নয়, নিজের স্বপ্নকেই বড় করে দেখেছেন মো: হাইয়ুল মিয়া। তাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও থেমে যাননি। প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলেছেন শিক্ষার আলোকিত পথে।

ময়মনসিংহের গৌরীপুর সরকারি কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হাইয়ুল এখন শুধু কলেজ ক্যাম্পাসেই নন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়েই আলোচিত একটি নাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে তার সংগ্রামী জীবনের গল্প ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। সেদিন অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন তার অদম্য আত্মবিশ্বাস দেখে।

তার বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বিসকা গ্রামে। বাবা মো. ইউনুছ আলী একজন ক্ষুদ্র কৃষক, মা ফিরোজা খাতুন গৃহিণী। চার ভাই ও দুই বোনের বড় সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা কখনোই ছিল না। তবুও পরিবারের সদস্যরা তাকে লেখাপড়া থেকে সরিয়ে নেননি। বরং স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছেন।

সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রতিদিন প্রায় সাত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সাইকেলে কলেজে যান হাইয়ুল। বহু পুরোনো সাইকেলটি মাঝেমধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। কখনো জোড়াতালি দিয়ে, কখনো মেরামত করে আবারও রওনা হন শ্রেণিকক্ষের উদ্দেশে। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন—জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি শিক্ষা।

শিক্ষাজীবনেও তার রয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। ২০১৯ সালে ড. আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফ দাখিল মাদ্রাসা থেকে জিপিএ-৪.৩৬ এবং ২০২১ সালে গৌরীপুর ইসলামাবাদ ফাজিল মাদ্রাসা থেকে জিপিএ-৪.৫৬ পেয়ে আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অনার্সের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষেও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে প্রমাণ করেছেন—শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মেধা ও পরিশ্রমই মানুষের আসল পরিচয়।

হাইয়ুল মিয়া বলেন, ‘কলেজে প্রথম দিকে গেলে অনেকেই আড়চোখে তাকাত, কেউ কেউ হাসাহাসিও করত। কষ্ট লাগত, কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। এখন তারাই আমাকে ভালোবাসে, উৎসাহ দেয়। শিক্ষকদের স্নেহ আর পরিবারের সহযোগিতাই আমাকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।’

তিনি জানান, লেখাপড়ার পাশাপাশি তার পায়ের চিকিৎসাও জরুরি। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। শেষ বর্ষে পড়াশোনার ব্যয়ও বেড়েছে। তারপরও স্বপ্ন ছেড়ে দিতে রাজি নন।

‘আমি সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করতে চাই। একটি সরকারি চাকরি করে পরিবারকে সচ্ছলতা দিতে চাই। আমার মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষও যে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, সেটাই প্রমাণ করতে চাই,’—দৃঢ় কণ্ঠে বলেন তিনি।

গৌরীপুর ইসলামাবাদ ফাজিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মো: এমদাদুল হক বলেন, ‘হাইয়ুল অত্যন্ত ভদ্র, মিষ্টভাষী ও অধ্যবসায়ী শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তাকে থামাতে পারেনি। নিয়মিত ক্লাস করত, পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। তার সাফল্য অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়।’

আজও সমাজের অনেক মানুষ শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে অক্ষমতা হিসেবে দেখেন। অথচ হাইয়ুল মিয়া দেখিয়ে দিচ্ছেন—স্বপ্ন দেখার জন্য লম্বা শরীরের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন লম্বা সাহসের। আর সেই সাহস নিয়েই তিনি এগিয়ে চলেছেন জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায়।

হয়তো কোনো একদিন সরকারি চাকরির পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে তিনি প্রমাণ করবেন—মানুষের উচ্চতা নয়, তার স্বপ্নের উচ্চতাই তাকে বড় করে তোলে।