নাজিরপুরে সরকারি হাসপাতালে রোগীর খাবারের বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীদেরকে নিম্ন মানের খাবার সরবরাহ, মাছ-মাংস নির্ধারিত পরিমাণের অর্ধেকেরও কম দেয়া এবং রোগী ভর্তির সংখ্যা বেশি দেখিয়ে খাবারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

আল আমিন হোসাইন, নাজিরপুর (পিরোজপুর)

Location :

Nazirpur
নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স |নয়া দিগন্ত

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীদেরকে নিম্ন মানের খাবার সরবরাহ, মাছ-মাংস নির্ধারিত পরিমাণের অর্ধেকেরও কম দেয়া ও রোগী ভর্তির সংখ্যা বেশি দেখিয়ে খাবারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কাছের আত্মীয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে খাবার সরবরাহের ব্যবসা করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা চেয়ারম্যানের গোপনীয় সহকারীর (সিএ) বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এ বিষয়ে দায় চাপালেন ঠিকাদার ও আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার (আরএমও) ওপর।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে রোগী, ঠিকাদার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।

সরেজমিনে, হাসপাতালের দাফতরিক হিসাবে মার্চ মাসের পাঁচ দিনের মধ্যে প্রথম তিন দিন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০ জন, ৪ মার্চ ৪৫ জন ও ৫ মার্চ ৪৩ জন দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, রোগীর সংখ্যা অর্ধেকেরও কম।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ৫০ শয্যার হাসপাতালে বিভিন্ন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বেড ফাঁকা রয়েছে। অথচ কর্তৃপক্ষের দেয়া তালিকায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৩ জন উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে অর্ধেক বিছানাই খালি।

সরেজমিনে হাসপাতালের পুরুষ, মহিলা ও শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি বেডে রোগী থাকলেও অনেক বেড ফাঁকা পড়ে আছে।

এসময় কয়েকজন রোগী ও স্বজন জানান, হাসপাতালে সাধারণত রোগীর চাপ খুব বেশি থাকে না। তবে কাগজপত্রে রোগী বেশি দেখানোর বিষয়টি তারা জানেন না।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রত্যেক রোগীর সপ্তাহে পাঁচ দিন দুই বেলা ১২৮ গ্রাম মুরগির মাংস বা মাছ পাওয়ার কথা। বাকি দুই দিন দেয়ার কথা ডিম বা মাছ। বাস্তবে একজন রোগী দুই বেলায় ৫০ গ্রামের বেশি মাছ-মাংস পান না। বাজারে মাছের দাম বেশি হওয়ায় প্রায় দিনই মাছের পরিবর্তে দেয়া হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি।

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, ৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগীপ্রতি প্রতিদিনের বরাদ্দ (সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের ভাত) ১৭৫ টাকা। বিশেষ দিবসে এ বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ২০০ টাকায়। দুপুরে ও রাতে বিআর ২৮ চালের ৩৩০ গ্রাম ভাত দেয়ার কথা। কিন্তু দেয়া হচ্ছে নিম্নমানের স্বর্ণা ইরি চাল। ডাল দেয়া হচ্ছে পানির মতো। মাঝে মধ্যে সবজি দেয়া হয়। সকালে দুই পিস পাউরুটি, একটি সেদ্ধ ডিম ও একটি পাকা সবরি কলা দেয়ার কথা। কিন্তু ভাত, মাছ-মাংস সবই পরিমাণে খুব কম দেয়া হয়। কলার আকার ছোট, সরবরাহ করা পাউরুটিও নিম্নমানের। রান্নার মান এত খারাপ, রোগীরা খেতে আগ্রহী হয় না।

রোগীরা জানান, খাবার নিয়ে অভিযোগ দিলেও অজ্ঞাত কারণে ব্যবস্থা নিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, খাবার বিষয়ে রোগীদের সাথে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রোগীরা বলেন, দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী খাবার দেয়া হয় না। সকালের নাশতার জন্য দুই পিস পাউরুটি, একটি ডিম, সামান্য চিনি ও ছোট কলা দেয়া হয়। দুপুরে মোটা চালের ভাত দেয়া হয়, যা খাওয়ার উপযোগী নয়। সরবরাহ করা ডাল পানির মতো পাতলা। মুরগির গোস্ত দেয়া হয় ৫০ গ্রামেরও কম। দাম বেশি হওয়ায় ১৫ দিনে এক দিনও মাছ জোটে না। ব্রয়লার মুরগি দিয়েই মাছের কাজ চালিয়ে দেয়া হয়। খাসির গোস্ত মেলে কালেভদ্রে।

এ বিষয়ে নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মশিউর রহমান জানান, ‘খাবারের বিষয়টি ঠিকাদারের ব্যাপার, হাসপাতালে রোগী ভর্তির বিষয়টি আরএমও দেখেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’

আরএমও ডাক্তার মো: মোস্তাফা কায়সারের নিকট জানতে চাইলে তিনি নিউজ করতে নিষেধ করেন এবং বলেন, আপনাদের বিষয়টি দেখবো।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ইসতিয়াক কন্সট্রাকশন, যার স্বত্বাধিকারী উপজেলা চেয়ারম্যানের সিএ মো: ইয়াসির আরাফাতের ভগ্নিপতি মো: রেজাউল করিম মোল্লা। তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাবার সরবরাহের কাজ পরিচালনা করেন সিএ আরাফাত নিজে।

এ বিষয়ে ঠিকাদার মো: রেজাউল করিম মোল্লার মোবাইল ফোনে কল দিলে তার স্ত্রী রিসিভ করে বলেন, ‘লাইসেন্স আমাদের, হাসপাতালে আমরা মাঝে মাঝে যাই। খাবারের রুটিন জানতে চাইলে জানান, আমার ভাই আরাফাত জানে, আপনারা কেন বিরক্ত করেন? আপনারা কী চান? এর আগেও একবার নিউজ করেছেন, কিছু করতে পারছেন? আপনাদের চেয়ে দুদুক ভালো।’

এ বিষয়ে নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের সিএ ইয়াসির আরাফাতের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

জেলা সিভিল সার্জন ডা: মো: মতিউর রহমান জানান, বিষয়টি অবশ্যই আপত্তিকর, আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।

পিরোজপুর জেলা প্রশাসক মো: আবু সাঈদ জানান, সরকারি চাকরি করে অনুমতি ছাড়া অন্য পেশায় থাকার সুযোগ নেই, আমাকে কয়েকটি পয়েন্ট দেন, আমি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।