ছাত্রাবাস বন্ধ ঘোষণা, হল ছাড়ার নির্দেশ

নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে আহত ১৫

নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

কামাল উদ্দিন সুমন, নারায়ণগঞ্জ

Location :

Narayanganj
নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে আহত ১৫
নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে আহত ১৫ |নয়া দিগন্ত

নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। হামলার ঘটনায় দুই পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে।

দুপুর ১২টার দিকে সরকারি তোলারাম কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে এক সভায় বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। দেড় ঘণ্টা পর পুলিশ উভয়পক্ষকে চাষাঢ়ার কলেজ রোডে মুখোমুখি অবস্থান থেকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সংঘর্ষে শিবিরের আহতরা হলেন তোলারাম কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি এমদাদুল হক শুভ, সাধারণ সম্পাদক তামিম, অর্থ সম্পাদক জুবায়েদ, মনি, ইসমাইল এবং ছাত্রদল নেতা তুহিন আহমেদসহ বেশ কয়েকজন।

সংঘর্ষের ঘটনার পর বিকেলে ইসদাইর এলাকায় অবস্থিত তোলারাম কলেজের ‘শের-ই বাংলা ছাত্রাবাস’ বন্ধের ঘোষণা দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম ও হোস্টেল সুপারের স্বাক্ষরিত এক নোটিশে বিকেল ৪টার মধ্যে এই ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্রদের হল ছাড়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত ছাত্রাবাস বন্ধ থাকবে বলেও জানানো হয়। কলেজের পাশে ‘ছাত্রী নিবাসের’ ছাত্রীদেরও হল গেট বন্ধ করে দেয়া হয়।

হলের এক শিক্ষার্থী মুঠোফোনে জানান, নিয়ম অনুযায়ী ছাত্রীরা পড়াশোনা ও টিউশনির জন্য রাত আটটা পর্যন্ত বাইরে থাকতে পারেন। কিন্তু সংঘর্ষের ঘটনার পর হল বন্ধ করে দেয়া হয়। পরিস্থিতি শিথিল না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বের না হওয়ার জন্য হল সুপার দারোয়ানকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

ছাত্রশিবিরের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সভাপতি অমিত হাসান বলেন, ‘তোলারাম কলেজের ভেতরে আমাদের নেতাদের মারধর করা হয়েছে। গত কয়েকদিনের রাজনৈতিক উত্তাপকে ঘিরে এ ঘটনা ছাত্রদল ঘটিয়েছে। আমরা সেখানে গেলে লাঠিসোঁটা দিয়ে আমাদের কয়েকজনকেও আঘাত করেছে। আমিও মাথায় আঘাত পেয়েছি।’

এছাড়া তোলারাম কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি এমদাদুল হক শুভ, সাধারণ সম্পাদক তামিম ইকবাল ও অর্থ সম্পাদক জুহাজ আহত হয়ে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলেও জানান অমিত। তাদের সংগঠনের আরো অন্তত ৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মনির হোসেন জিয়া জানান, ‘ওরা পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে। বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অনুষ্ঠান ছিল। গণঅভ্যুত্থান তো সবারই। সবাই এখানে অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু তারা পরিকল্পনা করে এসেছে এখানে ঝামেলা করবে। হামলায় ছাত্রদল নেতা তুহিন আহমেদসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘তারা শহীদ মিনারে লোকজন জড়ো করে রেখেছে। আমরা মাত্র ২০–৩০ জন ছিলাম। ওদের মনে হয়েছে আমরা ওদের মারব। আমরা কেন মারব, আমাদের সরকার। এটা তো আমাদের বদনাম। আমাদের এমন উদ্দেশ্য ছিল না। তারা যে এভাবে হামলা করবে আমরা কল্পনাও করিনি। তারা যেহেতু হামলা শুরু করেছে, ছাত্রদল এটা শেষ করবে।’

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিনুজ্জামান জানান, তোলারাম কলেজে আলোচনা সভায় বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে তাদের জখম মারাত্মক নয়।

খবর পেয়ে ফতুল্লা থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন এবং উভয়পক্ষকে সেখান থেকে সরিয়ে দেন বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তদন্ত করে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের পর এ এলাকায় যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, যারা এ কাজ করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে দেড়টার পর পুলিশ ছাত্রশিবিরের নেতাদের সরিয়ে দিলে তারা সেখান থেকে চলে গেলেও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা কলেজ রোড, জামতলা, চাষাঢ়া ও কালিরবাজার এলাকায় লাঠিসোঁটা হাতে মিছিল করেন। তাদের সাথে যুবদলের নেতাকর্মীদেরও দেখা যায়। বেলা আড়াইটাতেও তাদের বিভিন্ন সড়কে শিবিরের বিরুদ্ধে মহড়া দিতে দেখা যায়।

পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব, মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদসহ বিএনপির নেতা-কর্মীরা কলেজে যান। তারা অধ্যক্ষ ও কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন। বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বিএনপি নেতারা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের সংঘাতময় কার্যক্রম তারা প্রত্যাশা করেননি। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদেরও এই ধরনের ‘ধ্বংসাত্মক’ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা।

জামায়াতে ইসলামীর মহানগর শাখার আমির মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, ‘ফ্যাসিবাদকে দূর করতে আমরা একত্রে লড়াই-সংগ্রাম করেছি। আমাদের মধ্যে এই ধরনের সংঘাত কাম্য নয়। আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ চাই।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ছাত্রদল ও বিএনপির দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত বৃদ্ধি পেলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা দেশের সার্বিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। এতে বিতাড়িত স্বৈরাচারীরা সুযোগ নিতে পারে, যা কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না।’