পুরোনো বিতর্ক তুলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ আর নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এসময় তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক স্বার্থে কাউকে রাজাকার বা জঙ্গি আখ্যা দেয়ার সংস্কৃতি জনগণ আর গ্রহণ করছে না।’
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বালিকা বিদ্যালয় মাঠে উপজেলা জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
খুলনা-৫ আসনের (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) জামায়াত মনোনীত ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে জামায়াতের সাথে একসাথে কাজ করার সময় যুদ্ধাপরাধ, জঙ্গি- এসব অভিযোগ তোলা হয়নি। রাজনৈতিক স্বার্থে কাউকে রাজাকার বা জঙ্গি আখ্যা দেয়ার সংস্কৃতি জনগণ আর গ্রহণ করছে না। সাথে থাকলে সঙ্গী, আর সাথে না থাকলে জঙ্গি- এই দ্বিচারিতা মানুষ বুঝে গেছে।’
১৯৯১ সালের নির্বাচনের উদাহরণ দিয়ে তিনি দাবি করেন, ‘জামায়াত এককভাবে ১৮টি আসন পেয়েছিল এবং তখন উভয় বড় দলই জামায়াতের সমর্থন চেয়েছিল। তখন জামায়াত যুদ্ধাপরাধী ছিল না। পুরনো বিতর্ক তুলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ আর নেই।’
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত আমিরের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, ‘ওই অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ ডাকা হয়। এতেই প্রমাণিত হয় কারা এ হ্যাকিংয়ের সাথে জড়িত।’
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর নামে মিথ্যা বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এ ধরনের বক্তব্য ও আচরণ পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করছে। এ ধরনের উসকানি শেষ পর্যন্ত যারা করছে, তাদেরই ক্ষতি ডেকে আনবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিএনপির বন্ধুদের মাথাটা একটু খারাপ হয়ে গেছে। আপনারা টের পাচ্ছেন তো? এত মাথা খারাপ হয়েছে! জামায়াত ইসলামীর পুরুষদের সামনে দাঁড়াবার সাহস তাদের নেই। এখন আমাদের নারী কর্মীদের গায়ে তারা হাত তুলছে। দেখছেন তো, অন্তত ১০-১৫ জায়গায় দাঁড়িপাল্লার পক্ষে আমাদের মা-বোনেরা যখন যাচ্ছে, তাদের মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে। বোরখা খুলে নিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখবেন, যেটা বেশি ভাইরাল হয়েছে, একজন সাদা বোরখা পরিহিত মা দাঁড়িপাল্লার জন্য ভোট চাচ্ছেন, তাকে টেনে ধরে তার হিজাব-বোরখাটা খুলে নেয়া হচ্ছে। সে যখন বাধা দিচ্ছে, বিএনপির এক সন্ত্রাসী সেই মায়ের পেটে লাথি মেরেছে।’
‘বিএনপির একজন সোশ্যাল মিডিয়াতে বক্তব্য দিচ্ছে, দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কোনো নারী ভোট চাইতে গেলে তাদের কাপড় খুলে রেখে দেবে। ছি ছি ছি! মাথা কী পরিমাণ খারাপ হয়েছে! বিএনপির বন্ধুরা এত নিচে নামতে পারে যে মায়েদেরকে আমরা আমাদের জীবনের চেয়ে ভালোবাসি, সেই মায়ের গায়ে যদি তোমরা হাত তোলো, তার যদি বস্ত্র খুলে নিতে চাও, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে যদি তোমরা এত নিচে নামো, ক্ষমতায় গেলে তো তোমরা সারাদেশের মানুষের কাপড় খুলে নেবে,’ বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘শেরপুরের এক উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হাফেজ রেজাউল করিমকে পিটিয়ে পিটিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নির্বাচনের ব্যালট বিপ্লব শুরু হওয়ার আগে তোমরা যদি একটা দলের লোককে হত্যা করো, তাহলে তোমাদের পুরানো রূপ মানুষের কাছে উঠবে।’
জামায়াত সেক্রেটারি আরো বলেন, ‘আজকে খালিশপুর বিএনপির জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান একটি ভুয়া বিষয় নিয়ে আমাদের আমিরকে মিথ্যাবাদী বলেছে! নাউজুবিল্লাহ। উনি ফতোয়া দেন, উনি বলেন কে মুনাফেক, কে কাফের। উনি লন্ডন থেকে এসে এই ফতোয়া জারি করছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমিরে জামায়াত ডা: শফিকুর রহমানের ভাষণের সাথে তোমাদের তুলনা চলে না। ঠিক সেই সময় তার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে মিথ্যা কথা চালিয়ে দিয়ে একটা পরিস্থিতি তৈরির জন্য উস্কানি দেয়া হয়েছে। ঠিক, রাতে যখন তার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে, সাথে সাথে ছাত্রদলের ছেলেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ডেকেছে। এতে বোঝা যায়, যারা অ্যাকাউন্ট হ্যাক করলো, তারাই মিছিল ডেকেছে। যেটা আমাদের আইটি এক্সপার্টরা সংবাদ সম্মেলন করে জাতির সামনে উত্থাপন করেছেন। জাতির কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ পরিষ্কার।’
তিনি আরো বলেন, ‘গত ৫৪ বছরে জনগণ বারবার ভোট দিয়ে প্রতারিত হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি দখল, নদী-খাল দখল ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে একটি মহল জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে। হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টি করে রাজনীতি করা যাবে না।’
দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে- এ ধরনের প্রচারণাকে তিনি ভিত্তিহীন আখ্যা দেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘তাদের জীবদ্দশায় এসব বিতর্ক ছিল না।’
এসময় প্রধান বক্তার বক্তৃতায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ‘আগামীতে কেউ ভোট ডাকাতি করতে এলে ছাত্রসমাজ তার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সজাগ আছি, প্রস্তুত আছি। আমার ভোটাধিকার আমি নিয়ে ঘরে ফিরব, ইনশাআল্লাহ।’
ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মোক্তার হোসেনের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি আব্দুর রশীদ বিশ্বাসের পরিচালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য খুলনা জেলা আমির মাওলানা এমরান হুসাইন, জেলা সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, খুলনা মহানগরী ছাত্রশিবিরের সভাপতি আরাফাত হোসেন মিলন, কেন্দ্রীয় সহকারী গবেষণা সম্পাদক ওবায়দুর রহমান, খেলাফত মজলিসের খুলনা জেলা সহ-সভাপতি মুফতি আবদুল কাইয়ুম জমাদ্দার, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খুলনা জেলা সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা ও হাফেজ আমিনুল ইসলাম, জেলা ছাত্রশিবির সভাপতি ইউসুফ ফকির, সেক্রেটারি মোমিনুর রহমান, চুকনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি হাফেজ সাইদুল ইসলাম, ড. একরাম উদ্দিন সুমন, রাবির হাবিবুর রহমান হলের ভিপি আহমেদ আতাউল্লাহ ফারহান, ঢাবি ছাত্রশিবির নেতা আহমদ আতাউল্লাহ সালমান, ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি ডা: হরিদাস মন্ডল, সেক্রেটারি অধ্যক্ষ দেব প্রসাদ মন্ডল, মাওলানা হাবিবুর রহমান, খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা শরিফুল ইসলাম, মাওলানা আবু সাঈদ মাহমুদ, শ্রমিক নেতা মাওলানা সাইদুল্লাহ, শেখ মোসলেম উদ্দিন, মাওলানা আব্দুল হালিম, শেখ আবুল হোসেন, মাওলানা মতিয়ার রহমান, হাফেজ মইন উদ্দিন, সামিদুল হাসান লিমন প্রমুখ।



