দেশের নৌ-পরিবহন খাতে ডিজিটাল বিপ্লব

বিলোপ হচ্ছে বহুল বিতর্কিত লাইটার জাহাজের সিরিয়াল প্রথা

‘চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরসহ বিভিন্ন বন্দরে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের সিরিয়াল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ বহু পুরনো। পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ম্যানুয়াল থাকায় নানা অনিয়ম হয়েছে। পণ্য পরিবহন নীতিমালা-২০২৪ অনুযায়ী এই সফটওয়্যার নৌ পরিবহন খাতের আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং জাহাজ মালিক, আমদানিকারক ও অ্যাজেন্টদের দীর্ঘদিনের আস্থার সঙ্কট দূর হবে।’

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো

Location :

Chattogram
লাইটার জাহাজের সিরিয়াল প্রথা বিলুপ্ত করতে ডিজিটাল সফটওয়্যারের উদ্ভোধন করা হয়েছে
লাইটার জাহাজের সিরিয়াল প্রথা বিলুপ্ত করতে ডিজিটাল সফটওয়্যারের উদ্ভোধন করা হয়েছে |ফাইল ছবি

দেশের নৌ-পরিবহন খাতে ডিজিটাল বিপ্লব সাধিত হয়েছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বিডব্লিউটিসিসি’র অত্যাধুনিক লাইটার ভেসেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার উদ্বোধন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বহুল বিতর্কিত লাইটার জাহাজের সিরিয়াল প্রথার বিলোপ সাধিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের নৌ-পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা নিরসন এবং লাইটার জাহাজ ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে যাত্রা শুরু করছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘লাইটার ভেসেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার’।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদস্থ কাদেরী চেম্বারে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) কার্যালয়ে এই আধুনিক সফটওয়্যারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই সফটওয়্যারের উদ্বোধন করেছেন নৌ-পরিবহন অধিদফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে লাইটার জাহাজের সিরিয়াল ও বরাদ্দ নিয়ে অংশীজনদের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারণে সৃষ্ট ধীরগতি ও স্বচ্ছতার অভাব দূর করতে নৌ-পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক ও বিডব্লিউটিসিসি’র সভাপতি কমডোর মো: শফিউল বারীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই ডিজিটাল রূপান্তর সম্পন্ন হয়েছে।

শফিউল বারী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরসহ বিভিন্ন বন্দরে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের সিরিয়াল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ বহু পুরনো। পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ম্যানুয়াল থাকায় নানা অনিয়ম হয়েছে। পণ্য পরিবহন নীতিমালা-২০২৪ অনুযায়ী এই সফটওয়্যার নৌ পরিবহন খাতের আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং জাহাজ মালিক, আমদানিকারক ও অ্যাজেন্টদের দীর্ঘদিনের আস্থার সঙ্কট দূর হবে।’

সূত্র জানায়, লাইটার ভেসেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার বাংলাদেশের লাইটার জাহাজের সিরিয়াল ও বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনবে। প্রাথমিকভাবে বিডব্লিউটিসিসি এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে সিরিয়াল ও বরাদ্দ পদ্ধতির অটোমেশন করতে যাচ্ছে। পরে দ্রুতই এর সাথে পাইলটিং, ড্যামারেজ সেটেলমেন্ট ও অন্যান্য জটিল বিষয়গুলিও সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত হবে।

সূত্র মতে, বাংলাদেশের প্রথম লাইটার ভেসেল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার উন্নয়নে বিডব্লিউটিসিসিকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের প্রথম প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জাহাজী লিমিটেড। জাহাজী লিমিটেড এই সফটওয়্যারটি নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে কাজ করেছে।

সূত্র জানিয়েছে, লাইটার ভেসেল-ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের বেশকিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা হলো—

১. স্বয়ংক্রিয় সিরিয়াল ও স্বচ্ছতা : পতেঙ্গায় পৌঁছানোর পর জাহাজের স্টাফরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মাত্র এক মিনিটে ডিজিটাল সিরিয়াল নিশ্চিত করতে পারবেন। এতে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার ভোগান্তি কমবে, খরচ বাঁচবে।

২. জিও-ফেন্সিং ও সঠিক সিরিয়াল : ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে সিরিয়াল নিশ্চিত করতে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সিরিয়াল বাইপাস করার সুযোগ বন্ধ করবে।

৩. রিয়েল-টাইম বার্থিং লিস্ট : জাহাজ মালিকরা ঘরে বসেই মোবাইল অ্যাপে তাৎক্ষণিক বার্থিং লিস্ট দেখতে পাবেন, যা মালিকপক্ষের দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি দূর করবে।

৪. জরুরি সুরক্ষা (এসওএস) : মাঝসমুদ্রে যেকোনো দুর্ঘটনায় দ্রুত সহায়তার জন্য এসওএস অ্যালার্ম যুক্ত করা হয়েছে, যা কর্তৃপক্ষ ও নিকটস্থ জাহাজকে তৎক্ষণাৎ সতর্ক করবে এবং দুর্ঘটনায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে সহায়তা করবে।

৫. স্টাফ প্রোফাইল ও মাইলেজ ট্র্যাকিং : মাস্টার ও ড্র্রাইভারদের তথ্য ও তাদের কাজের অভিজ্ঞতা ডিজিটাল প্রোফাইলে সংরক্ষিত থাকবে, যা দক্ষ জনবল নিয়োগে সহায়ক হবে।

৬. দৈনিক স্ট্যাটাস ও আবহাওয়া বার্তা : জাহাজে পণ্য লোডিং-আনলোডিংয়ের সর্বশেষ অবস্থা এবং জরুরি আবহাওয়া বার্তা সরাসরি মালিক ও প্রয়োজনীয় পক্ষের কাছে মোবাইলে পৌঁছে যাবে।

৭. ড্যামারেজ সেটেলমেন্ট সহজীকরণ : জাহাজের মুভমেন্টের ডিজিটাল ও ফরেনসিক ডেটা সংরক্ষিত থাকায় ড্যামারেজ নিয়ে জটিলতা ও সময়ক্ষেপণ কমে আসবে।

৮. সহজ ও স্মার্ট কমপ্লায়েন্স : বে ক্রসিং, সার্ভে সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র অ্যাপে সংরক্ষিত থাকবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ট পাওয়া যাবে, ফলে সনদ নবায়ন হবে দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত।

৯. ডিজিটাল পাইলটিং কুপন : পাইলটিং কুপনের জন্য আর বারবার কুপন কেনা বা সিল মারার প্রয়োজন হবে না। অ্যাপ থেকেই এক ক্লিকে বিকাশ বা ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি বিআইডব্লিউটিএ-তে অর্থ পরিশোধ করা যাবে। এতে জাহাজ মালিক, লোকাল অ্যাজেন্ট ও স্টাফদের ভোগান্তি কমবে এবং স্বচ্ছ হিসাব সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে।

বিডব্লিউটিসিসি মনে করে, এই অটোমেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের নৌ-পরিবহন খাত বিশ্বমানের আধুনিকতায় উন্নীত হবে এবং ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।