রাজশাহীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, রিমান্ডে নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা মামলা করতে ভয় পান বা নানা বাধার মুখে পড়েন।
তারা বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার জটিলতা ভুক্তভোগীদের নিরুৎসাহিত করে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহী নগরীর একটি রেস্টুরেন্টের কনফারেন্স রুমে বাংলাদেশে নির্যাতন প্রতিরোধ, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং মানবাধিকার কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নির্যাতনবিরোধী সনদ ও এর ঐচ্ছিক প্রটোকল বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন।
এতে ভিকটিম, পুলিশ প্রশাসন, চিকিৎসক, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে নির্যাতনবিরোধী সনদ অনুমোদন করলেও এখনো এর ঐচ্ছিক প্রটোকল অনুস্বাক্ষর না করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
তারা উল্লেখ করেন, ঐচ্ছিক প্রটোকল অনুস্বাক্ষরের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে একটি স্বাধীন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঠন, আটকস্থলে নিয়মিত ও নিরপেক্ষ পরিদর্শন নিশ্চিত করা এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা ও সুরক্ষা জোরদার করা সম্ভব।
বক্তারা আরো বলেন, ২০১৩ সালের ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ শক্তিশালী হলেও বাস্তবে মামলার সংখ্যা কম এবং বিচার আরো কম হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নির্যাতন কিছুটা হ্রাস লক্ষ্য করা গেলেও তা টেকসই করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
এ সময় তারা বলেন, নির্যাতন প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী আইনি কাঠামোর বাস্তবায়ন এবং মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বক্তারা নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের সমস্যা উঠে আসা প্রমাণ করে— এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ইস্যু নয়; বরং জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এর স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
অধিকার-এর রাজশাহী অঞ্চলের সমন্বয়কারী মঈন উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও পরিচালক (প্রোগ্রাম) সাজ্জাদ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসমা সিদ্দিকা, রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন, রামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা: কফিল উদ্দিন, রাজশাহী আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কাসেম, রাজশাহী মহানগর আদালতের পিপি আলী আশরাফ মাসুম, জেলা আদালতের পিপি রইসুল ইসলাম, সমিতির সাধারণ সম্পাদক পারভেজ তৌফিক জাহেদী, গুম থেকে ফিরে আসা রাজশাহী জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মুর্তজা, নির্যাতনের পর হত্যার শিকার নুরুল ইসলাম শাহিনের ছোট ভাই ড. ফজলুল হক তুহিন, নির্যাতনের পর হত্যার শিকার শহিদুল ইসলামের বড় ভাই ও রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন সরকার, গুম থেকে ফিরে আসা আতিকুর রহমান, নির্যাতনের শিকার রফিকুল ইসলাম বকুল, গুম থেকে ফিরে আসা মাসুদ রানা প্রমুখ।



