লাভজনকভাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলাচলকারী দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেনাপোল-খুলনা-মোংলা ভায়া যশোর রুটের বেনাপোল কমিউটার (বেতনা) ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) থেকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলবে জনপ্রিয় এ কমিউটার ট্রেন।
এইচ অ্যান্ড এম ট্রেডিং করপোরেশন নামের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রেলওয়ের এ বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
কমিউটার ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেয়ায় ক্ষুব্ধ যাত্রীরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেল চলাচলের দাবি জানান।
রেল সংশ্লিষ্টরা জানান, লিজ দিলে রেলওয়ের বর্তমান আয় থেকে বেশি অর্থ পাওয়া যাবে এ অজুহাতে কিছু অসাধু কর্মকর্তা ট্রেনটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছিল।
স্টেশনে চেকার স্বল্পতায় টিকিট কাটায় কিছুটা সমস্যা হয়। এ সমস্যা সমাধানে চেকার নিয়োগসহ টিকিট কাটার জনসচেতনতা বাড়ালে সরকারিভাবেই বেশি লাভ করা সম্ভব বলে মত সেবা প্রত্যাশীদের। আর বেসরকারি খাতে দিলে ঝামেলা বাড়ার পাশাপাশি গুনতে হবে বাড়তি ভাড়া। ফলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কমিউটার ট্রেন পরিচালনার দাবি জানান তারা।
রেল সূত্র জানায়, লাভজনক রুটটি বেসরকারি টিকিট ব্যবস্থাপনার জন্য ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ রেলওয়ে, ১৯ মে দরপত্র খোলা ও জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে যাচাই-বাছাই শেষে রেলের মূল্যায়ন কমিটিতে পাঠানো হয়। পরে যাচাই-বাছাই শেষে এইচ অ্যান্ড এম ট্রেডিং করপোরেশন নামের প্রতিষ্ঠানকে তিন বছরের জন্য ট্রেনটির টিকিট ব্যবস্থাপনার কার্যাদেশ দেয়া হয়।
সেবা প্রত্যাশীদের দাবি, যাত্রীদের আন্দোলনের ভয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
রেল সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৯ সালের ২৩ নভেম্বর এ রুটে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল উদ্বোধন করা হয়। এরপর ২০১০ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ১১ বছর সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। পরে মেসার্স বান্না এন্টারপ্রাইজ ও ইসলাম শিপ বিল্ডার্স বেসরকারি খাতে এ ট্রেন পরিচালনা করে।
পরে, বেসরকারিভাবে টিকিট ব্যবস্থাপনা অনিয়ম, চোরাকারবারি ও টানা পার্টির দখলে চলে গেলে ২০১৩ সালে ট্রেনটি আবার সরকারি তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ফলে বাড়তে থাকে যাত্রী, এ সময় বেশিরভাগ যাত্রী এ রুটে ভারতে যাতায়াত করে।
জানা যায়, লাভজনক হওয়ায় যাত্রীসেবার মান বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ১ মার্চ থেকে এ রুটে দিনে দু’বার কমিউটার ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এ ট্রেন থেকে মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা আয় হয়, যা বেসরকারি ব্যবস্থাপনার তুলনায় অনেক বেশি।
যাত্রীদের অভিযোগ, লাভজনক ট্রেনটির প্রতি নজর পড়েছে সুযোগসন্ধানী অসাধু ব্যক্তিদের। তাদের যোগসাজশে লোকসান দেখিয়ে ট্রেনটি বেসরকারি টিকিট ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয়ার যুক্তি তৈরি করা হয়।
বেসরকারি টিকিট ব্যবস্থাপনায় গেলে বগি কমে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি করে বসতে হয়। তাই সরকারি খাতে থাকার দাবি তাদের। চেকিংয়ের ব্যবস্থা বাড়লে-বাড়বে রাজস্ব আয়। টিটিদের বিরুদ্ধে রয়েছে অনৈতিকতার অভিযোগ।
সাইফুল ইসলাম সাঈদ নামে এক যাত্রী বলেন, ‘খুলনা থেকে বাসে বেনাপোল আসতে সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা, ভাড়া আড়াইশ টাকা। আর কমিউটার ট্রেনে খুলনা থেকে বেনাপোল আসতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা, ভাড়া মাত্র ৫০ থেকে ৪৫ টাকা। এ কারণে খুলনা থেকে জেলা শহর যশোরসহ ভারতে যাতায়াতকারী যাত্রীরা বাসের চেয়ে কম খরচে ট্রেনে যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আগের তুলনায় কমিউটার ট্রেন থেকে সরকারি কোষাগারে বেশি টাকা জমা হচ্ছে। বর্তমানে গড়ে প্রতি মাসে এ ট্রেন থেকে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা টাকা আয় করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ লাভজনক ট্রেনটির প্রতি নজর পড়েছে সুযোগসন্ধানী অসাধু ব্যক্তিদের।’
আরেক যাত্রী মাহমুদুল হাসান নাবিল বলেন, ‘বেনাপোল-খুলনা-মোংলা কমিউটার ট্রেনটি বেসরকারি খাতে লিজ দেয়া হলে এ ট্রেনে যাতায়াতকারী যাত্রীরা ভয়াবহ ভোগান্তির শিকার হবেন। আর এ সুযোগে চোরাকারবারিরা আগের মতো আবার তাদের আধিপত্য বিস্তার করবে।’
লাভজনক ট্রেনটি বেসরকারি খাতে লিজ না দিতে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যাত্রীরা।
টেন্ডার পাওয়া এইচ অ্যান্ড এম ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক হুমায়ন আহমেদ বলেন, ‘আমরা কাজ পেয়েছি। অনেক আগেই আমাদের দায়িত্বে এ রুটটি চলার কথা ছিল। তবে বাজেটসহ অন্যান্য কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। রোববার থেকে বেসরকারি টিকিট ব্যবস্থাপনায় আমাদের দায়িত্বে এ রুটে ট্রেন চলাচল করবে।’
বেনাপোল রেলস্টেশন মাস্টার আয়নাল হাসান বলেন, ‘বেতনা কমিউটার ট্রেন রোববার থেকে বেসরকারি টিকিট ব্যবস্থাপনায় চলাচল করবে। ভাড়া একই থাকবে। আগে প্রতি মঙ্গলবার ট্রেনটি বন্ধ থাকতো। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এখন আর বন্ধ থাকবে না। সপ্তাহের সাত দিনই চলবে এ ট্রেন।’
পাকশীতে কর্মরত রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার মিহির কুমার গুহ বলেন, ‘নীতিমালা মেনেই ট্রেনটি বেসরকারি খাতে লিজ দেয়া হয়েছে। লোকসানের কারণে অনেক সময় বেসরকারি খাতে লিজ দেয়া হয়। কোনো কোম্পানি যদি শেষ ছয় মাসের আয়ের চেয়ে বেশি টাকা দিতে চায়, তাহলে তাদের অনুকূলে লিজ দেয়া হয়ে থাকে।’
যে কোনো সময় লিজ বাতিলের ক্ষমতা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের থাকবে বলেও তিনি জানান।



