গাজীপুর সিটির বাজেট ঘোষণা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগর উন্নয়নে অগ্রাধিকার

‘রাজেন্দ্রপুরে একটি আধুনিক এসটিএস নির্মাণের কাজ চলছে। নাওজোড়, চেরাগআলী ও টঙ্গী বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে আরো ২০টি আধুনিক এসটিএস নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে।’

মো: আজিজুল হক, গাজীপুর মহানগর

Location :

Gazipur
নগর ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট সভা
নগর ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট সভা |নয়া দিগন্ত

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পাঁচ হাজার ১০২ কোটি ৩৫ লাখ আট হাজার টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৪৮০ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে দুই হাজার ৬২১ কোটি ৮৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা সমাপনী স্থিতি থাকবে।

রোববার (২৬ জুলাই) দুপুরে নগর ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট সভায় সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: শওকত হোসেন সরকার এ বাজেট ঘোষণা করেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তানজিলা খানম। এতে সিটি করপোরেশনের সচিব, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়াসহ বিভিন্ন জোনের কর্মকর্তা ও ওয়ার্ড সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে প্রারম্ভিক স্থিতি হিসেবে দুই হাজার ৪৩৭ কোটি ২৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা, রাজস্ব (সাধারণ তহবিল) থেকে ৪৪৩ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, পানি সরবরাহ তহবিল থেকে ৭০ কোটি ৮০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, সরকারি উন্নয়ন খাতে ১৪০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট ও ডিপিপিভিত্তিক প্রকল্প থেকে দুই হাজার ১০ কোটি ৯১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে মোট ব্যয়ের মধ্যে রাজস্ব (সাধারণ তহবিল) খাতে ৪১৭ কোটি ৬৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা, পানি সরবরাহ খাতে ৭৮ কোটি চার লাখ ৭০ হাজার টাকা, সরকারি অনুদানে উন্নয়ন খাতে ১৩৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, নিজস্ব রাজস্বভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্পে ২৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট ও ডিপিপিভিত্তিক প্রকল্পে এক হাজার ৬০৮ কোটি ৭৩ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সভায় একইসাথে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন হাজার ৪৬৩ কোটি ছয় লাখ ৯৭ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করা হয়। সংশোধিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ২৫ কোটি ৮০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা এবং সমাপনী স্থিতি দেখানো হয়েছে দুই হাজার ৪৩৭ কোটি ২৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

বাজেট ঘোষণা করে প্রশাসক মো: শওকত হোসেন সরকার বলেন, ‘এবারের বাজেট জনকল্যাণমুখী। নগরকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তুলতে রাস্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশক নিধন কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ খাতে প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে ৩৭টি যানবাহন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। বর্জ্য অপসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।’

প্রশাসক বলেন, ‘গাজীপুর চৌরাস্তায় সড়কের ওপর দীর্ঘদিনের বর্জ্য ফেলার সমস্যা সমাধানে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করা হয়েছে। রাজেন্দ্রপুরে একটি আধুনিক এসটিএস নির্মাণের কাজ চলছে। নাওজোড়, চেরাগআলী ও টঙ্গী বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে আরো ২০টি আধুনিক এসটিএস নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘নগর সৌন্দর্যবর্ধন, বৃক্ষরোপণ ও খাল পুনঃখনন খাতে প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রায় তিন হাজার বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিআরটি স্টেশনগুলোতে সৌন্দর্যবর্ধন, রঙ, গ্রাফিতি ও মেরামতের কাজ চলছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ এবং মেরামতে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নাওজোড়-কাশিমপুর সেতু ও জয়দেবপুর রেলওয়ে ওভারপাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।’

পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে টঙ্গীর ১৫টি ওয়ার্ড ও জয়দেবপুরের আটটি ওয়ার্ডে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে প্রশাসক বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জোনেও পানি সরবরাহ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিউনিটি সেন্টার ও কবরস্থান নির্মাণের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

স্বাস্থ্য খাতে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সাফল্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির তথ্য জাতীয় পর্যায়ের ই-ট্র্যাকার সার্ভারে শতভাগ অন্তর্ভুক্ত করে গাজীপুর সিটি করপোরেশন জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। ২০২৫ সালের টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচিতে ঢাকা বিভাগে প্রথম, সিটি করপোরেশন পর্যায়ে দ্বিতীয় ও জাতীয় পর্যায়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে গাজীপুর। ২০২৬ সালের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতেও জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে এক লাখ ৫০ হাজার লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ, ৫৭টি ওয়ার্ডে মাইকিং, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কয়েকটি ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব বিটিআই প্রয়োগ করা হয়েছে।’

গাজীপুর সিটি প্রশাসক বলেন, ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৯টি খালের মধ্যে কয়েকটি পুনঃখনন করা হয়েছে। অবশিষ্ট খালগুলো পুনঃখননের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ও খেলাধুলার উন্নয়নে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব উদ্যোগে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। কোনাবাড়ীতে আরো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, যা আগামী অর্থবছর থেকে চালু হবে। এছাড়া সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ওয়ার্ডে ৫৭টি খেলার মাঠ ও আটটি জোনে আরো মাঠ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরে কোনো হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানো হয়নি। আগামী ২০২৮-২৯ অর্থবছরে পুনরায় রি-অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম শুরু হবে।’

তিনি নগরবাসীকে নিজেদের শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান এবং বাজেট বাস্তবায়নে সাংবাদিক ও নগরবাসীর গঠনমূলক সহযোগিতা কামনা করেন।