পিনাক লঞ্চডুবির ১২ বছর আজ

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট মাদারীপুরের কাওরাকান্দি ঘাট থেকে প্রায় আড়াইশতাধিক যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসা পিনাক-৬ যাত্রীবাহী লঞ্চটি পদ্মায় ডুবে যায়।

গোলাম মঞ্জুরে মাওলা অপু, লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ)

Location :

Munshiganj
ডুবে যাওয়ার সময় লঞ্চ পিনাক
ডুবে যাওয়ার সময় লঞ্চ পিনাক |নয়া দিগন্ত

‘ও গাঙ, তুই আমার মাইয়্যারে দে। ও রুখসানা তুই কোথায়? পদ্মা কি সব নিয়া যাইবো। আমাগো বাঁচতে দিবো না।’ ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিখোঁজ স্বজনের প্রতীক্ষায় রাতভর পদ্মার পাড়ে আহাজারি করছিলেন রাজধানীর কেরানীগঞ্জ উপজেলার চুনকুটিয়া এলাকার বাসিন্দা শাহানাজ। এ পরিবারের চার সদস্য ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন।

ওই দিন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাওরাকান্দি ঘাট থেকে মাওয়াগামী এমএল পিনাক-৬ নামে লঞ্চে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তারা। কিন্তু লঞ্চ দুর্ঘটনায় পদ্মার করাল স্রোতের তোড়ে তলিয়ে যায় এ পরিবারের রোকসানা, মাহিন ও মিলি। ওই সময় তিনি আরো বলেন, জীবিত তো নয়ই, মৃত লাশও কি দেখতে পাবো না।

ওরা তিন বোন। নুসরাত জাহান হীরা, ফাতেমা তুজ জোহরা স্বর্ণা ও জান্নাতুল নাইম লাকি। এদের মধ্যে লাকি তাদের খালাতো বোন। গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাদিরপুরে। মাওয়ায় লঞ্চডুবির ঘটনায় প্রথম যে লাশ উদ্ধার হয়, সেটি হীরার লাশ হলেও এদের মধ্যে বাকি দুইজনকে আর পাওয়া যায়নি। তারা এখন শুধুই স্মৃতি। সেই দুর্ঘটনার কথা মনে করে আজও পরিবারটির মাঝে নেমে আসে স্বজন হারানোর বেদনা।

আজ মঙ্গলবার ( ৪ আগস্ট)
পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনার দীর্ঘ একযুগ অতিবাহিত হলেও সেই সময়ের এ রকমই অনেক পরিবারের আহাজারি আর বেদনাবিধুর খণ্ডচিত্র ও স্মৃতিগুলো এখনো ভেসে আসে পদ্মা পাড়ে। পিনাকের মতোই প্রমত্তা পদ্মার গভীর জলরাশির মধ্যে হারিয়ে গেছে তাদের কতই না প্রিয়জন। এখন তারা শুধুই স্বজনদের স্মৃতির করিডোরে। আগস্ট মাস এলেই তাদের মতো আরো কতো পরিবারের মাঝে প্রবল হয় এমনই দীর্ঘশ্বাস।

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট মাদারীপুরের কাওরাকান্দি ঘাট থেকে প্রায় আড়াইশতাধিক যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসা পিনাক-৬ যাত্রীবাহী লঞ্চটি পদ্মায় ডুবে যায়। এই লঞ্চডুবির দুর্ঘটনার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চটি উদ্ধারকার্যক্রম শুরু করে।

তাদের সাথে যুক্ত হন নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। লঞ্চটি উদ্ধারের জন্য চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদাপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যায়ক্রমে আনা হয় অত্যাধুনিক প্রায় ১৭টি উদ্ধারকারী জাহাজ ও একডজনের বেশি টাগ বোট।

উদ্ধারকাজে বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করেন প্রায় ৭৫০ জন উদ্ধারকর্মী। পিনাক-৬ উদ্ধারকাজে নিয়োজিত ছিল বিআইডব্লিউটিএর নয়টি জাহাজ রস্তুম, নির্ভীক, সন্ধানী, তিস্তা, টাগবোট ৮-৩৯৭, আইটি-৩৯৪, বদ্বীপ ও তুরাগ। এ ছাড়া নৌবাহিনীর দু’টি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জরিপ-১০ ও কাণ্ডারি-২ নামে দু’টি জাহাজ, কোস্টগার্ডের একটি, ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিশাসক, অগ্নিবিনাশ ও রেসকিউ-২ নামে তিনটি ছোট বড় জাহাজ।

এসব জাহাজ থেকে ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক সব যন্ত্র সাববটম প্রোফাইল, সাইড স্ক্যান সোনার, ইকো সাউন্ডার, ইকোগ্রাফি, সাব বটম প্রোফাইলারসহ আরো অনেক কিছু। বাদ যায়নি সনাতন পদ্ধতিতে উদ্ধারকার্যক্রমও। কিন্তু কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছিল না পিনাক-৬ লঞ্চটিকে। অবশেষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্ধারকারী জাহাজ কাজরি-২ পদ্মানদীর তলদেশে একটি (মেটালিক রেক) ধাতববস্তু আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। ওই বস্তুটিকে ঘিরে শুরু হয় নানা কৌতূহল।

মূলত বস্তুটি কী তা শনাক্ত করতে একের পর এক অভিযান চালাতে থাকে কাণ্ডারি-২ ও জরিপ-১০ নামে জাহাজ দু’টি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিনাকের কাছে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল তারা সবাই। উদ্ধার অভিযানের আট দিন পর অনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় উদ্ধারকার্যক্রম। এই ঘটনায় ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা গেলেও নিখোঁজ ছিলেন অনেকে। সরকারি হিসাবে নিখোঁজ তালিকায় ছিল আরো ৬১ জন। তবে দীর্ঘ এক যুগ পরেও আজও সন্ধান মেলেনি লঞ্চটির।

এ দিকে লঞ্চ দুর্ঘটনায় ওই সময় বিআইডব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর হোসেন ভূঁইয়া বাদি হয়ে লঞ্চের মালিক আবু বকর সিদ্দিককে প্রধান আসামি করে ছয়জনের বিরুদ্ধে লৌহজং থানায় মামলা করেন। তবে এরই মধ্যে মারা গেছেন মামলার প্রধান আসামি লঞ্চটির মালিক আবু বক্কর সিদ্দিক।

এ বিষয়ে মামলার বাদি বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন পরিবহন পরিদর্শক জাহাঙ্গীর হোসেন ভূঁইয়া সকালে নয়া দিগন্তকে জানান, আমি এখন চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। এখন পর্যন্ত মামলাটির বিচারকাজ কতদূর অগ্রগতি হয়েছে সে সম্পর্কে আমি শতভাগ নিশ্চিত নই। তবে মামলাটি এতোদিনে শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মুন্সীগঞ্জ জেলা দায়রা জজ আদালতের পিপি সুমন মিয়া সরদার রাতে নয়া দিগন্তকে জানান, এই মুহুর্তে এ মামলার বিচারকাজ কোন আদালতে এবং কোন পর্যায়ে রয়েছে তা আমি অবগত নই। বিষয়টি জেনে বলতে পারবো।

আর তাড়া করবে না লঞ্চ ডুবির ভয়াবহতা
অন্যদিকে, পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পর একেবারেই পাল্টে গেছে দক্ষিবঙ্গের যাত্রী সাধারণের পারাপারের পুরনো সেই দৃশ্যপট। সেতু চালু পরই মাওয়া তথা শিমুলিয়া থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ। এখন মাত্র ৬ মিনিটেই সেতুর বুকে চিড়ে গন্তব্যে পৌছে যাচ্ছেন দক্ষিণবঙ্গের লাখো যাত্রী। উত্তাল পদ্মার বড় বড় ঢেউ এখন শুধু অবলোকন করেন গাড়িতে বসেই। আর দুর্ঘটনার কথা ভেবে লঞ্চ ডুবিতে প্রিয়জন হারানোর আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে না তাদের। কিন্তু পিনাকের ক্ষত ভুলতে পারেননি তারা আজও। স্বপ্নের পদ্মাসেতু চালুর মধ্য দিয়ে পিনাক ডুবির সেই স্মৃতি কিছুটা হলেও ভুলতে পারছেন দক্ষিণবঙ্গের প্রিয়জন হারানো স্বজনেরা।

পিনাক দুর্ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতি ভুলতে পারছেন না দক্ষিণবঙ্গের গোপালগঞ্জের মোকসেদপুরের বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম। তিনি জানান, পিনাক ডুবির ভয়াবহ সেই স্মৃতি ভুলে যাওয়ার নয়। শুধু স্মৃতিই নয়, ওই ঘটনার পর থেকে অনেকবার পদ্মা পার হয়েছি ফেরিতে করে। কিন্তু যাইহোক পিনাকের মতো দুর্ঘটনা আমরা ভুলে যেতে চাই। এখন পদ্মা সেতু হওয়ায় সেই আতঙ্ক আর নেই।