রংপুরে ১০ তলা আবাসিক ভবনের ছাদ থেকে পড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী তরুণীর মৃত্যুর ঘটনায় এক মেডিক্যাল শিক্ষার্থীকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে করা মহাসড়ক অবরোধ সোয়া দুই ঘণ্টা পর তুলে নিয়েছে মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও ইন্টারনি চিকিৎসকরা।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাত সাড়ে ৭টা থেকে নগরীর কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন তারা। এতে ঢাকাসহ সারাদেশের সাথে রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড়ের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকে।
শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকরা মেডিক্যাল মোড় থেকে হাজিপাড়া মোড় পর্যন্ত এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই মেডিক্যাল শিক্ষার্থী শাহরিয়ার সাকিনকে গ্রেফতার দেখায়।
অবরোধে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা আরো অভিযোগ করেন, মৃত শিক্ষার্থীকে ব্যাচে প্রাইভেট পড়াতেন ওই মেডিক্যাল শিক্ষার্থী। পরে পড়ানো বাদ দেন। সেই বিষয়টি ডিবি অফিসে জানাতে গেলে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে সেখানে আটক করা হয়। এরপর মৃত শিক্ষার্থীর পরিবারকে ডেকে মামলা দিয়ে তাকে চালান করা হয়েছে। অবিলম্বে তাকে মুক্তির দেয়া না পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
পরে সেখানে উপস্থিত হন মহানগর উপ পুলিশ কমিশনার ক্রাইম মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে পরি সদস্যরা। তারা ঘটনাটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার সাকীনের মুক্তির আল্টিমেটাম দিয়ে রাত পৌনে ১০টায় অবরোধ তুলে নেয় তারা।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সাকিন গ্রেফতারের বিষয়টি আরো নিবিড় ভাবে তদন্ত করা হবে। বিষয়টি আমরা শিক্ষার্থীদেরকে জানিয়েছি। শিক্ষার্থীরা মেনে নিয়ে অবরোধ তুলে নিয়েছেন। এখন মহাসড়ক এলাকা সম্পূর্ণ যানবাহন চলাচল উপযোগী হয়েছে।’
সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে নগরীর সেন্ট্রাল রোডে নর্থ ভিউ হোটেলের ১০ তলার রুফটপ থেকে পড়ে মৃত্যু হয় রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজসাত জাহানের। ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেলে মামলা করেন তার বাবা নজরুল ইসলাম। তাতে গ্রেফতার সাকিনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। সন্ধ্যায় সাকিনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলায় সাকিনের বিরুদ্ধে নিহত শিক্ষার্থীর সাথে প্রেম এবং মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শাহরিয়ার সাকিনকে দুপুরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বিকেল সাড়ে ৫টায় মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে উপ পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, মঙ্গলবার দুপুরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাস থেকে ওই শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়। তার নাম শাহরিয়ার শাকীন। তিনি রংপুর মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি নগরীর ধাপ চিকলি ভাটা এলাকার ফোরকান মিয়ার ছেলে।
ব্রিফিংয়ে উপ-পুলিশ কমিশনার দাবি করেন, নিহত শিক্ষার্থীর বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে তথ্য প্রমাণের আলোকে শাহারিয়ারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মেয়েটির সাথে শাহরিয়ারের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তাকে মানসিক নির্যাতন করত। মোবাইলে কথাবার্তা হতো। তার সাথে কথা বলার মোবাইল রেকর্ডও পাওয়া গেছে। আত্মহত্যার আগে রিসেট দেয়ায় ওই তরুণীর মোবাইলে কোনো অ্যাপস পাওয়া যায়নি। যথেষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তবে গ্রেফতার শাহরিয়ার সাকিন কোতোয়ালি থানা থেকে পুলিশের গাড়িতে ওঠার সময় উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘ওই শিক্ষার্থী আমার স্টুডেন্ট ছিল। ওরা চারজন একসাথে আমার ব্যাচে পড়তো। পড়ানোর সময় আমি যখন টের পাই মেয়েটি আমাকে পছন্দ করে তখন আমি ওই ব্যাচটি পড়া বন্ধ করে দেই। পরে ওর মায়ের অনেক রিকোয়েস্টে আর একটা ব্যাচের সাথে পড়িয়েছিলাম। কিন্তু তখন সে আমার সাথে হোয়াটসঅ্যাপে নক করে এবং আমাকে পছন্দের কথা জানালে আমি আবারো তাকে পড়ানো বন্ধ করে দেই। সেটাও তিন মাস আগে। ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হওয়ায় বিষয়টি জানার পর আমি বিষয়গুলো জানানোর জন্য মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ডিবি অফিসে যাই। তখন ডিবির উপ- পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী আমাকে আটক করে ওর অভিভাবকদের দিয়ে মামলা করায়। ওই মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনায় কোনোভাবেই আমি যুক্ত নই। যদি যুক্ত থাকতাম তাহলে নিজেই ডিবি অফিসে যেতাম না।’
শাহরিয়ার সাকিনের এই অভিযোগের ব্যাপারে ডিসি (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, সাকিনের অভিযোগ মিথ্যা। সুস্পষ্ট তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মৃত শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে মামলা করেছেন।



