মিয়া গোলাম পরওয়ার

চাঁদাবাজরাই এখন সংখ্যালঘুদের কাছে ভোট চাইছে

যারা ৫ আগস্টের পর ডুমুরিয়ায় চাঁদাবাজি ও ভাঙচুর চালিয়েছে, তারাই এখন আবার সংখ্যালঘুদের কাছে গিয়ে নিরাপত্তা দেয়ার নামে ভোট চাইছে। তিনি বলেন, চাঁদা, কার্ড আর মিথ্যার রাজনীতি দিয়ে বাংলার মানুষকে আর বোকা বানানো যাবে না।

মো: আনোয়ার হোসেন আকুঞ্জী, ডুমুরিয়া (খুলনা)

Location :

Dumuria
ডুমুরিয়ার চুকনগর বাজারে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন দেন খুলনা-৫ আসনের এমপি প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার
ডুমুরিয়ার চুকনগর বাজারে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন দেন খুলনা-৫ আসনের এমপি প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার |নয়া দিগন্ত

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পরপরই খুলনার ‍ডুমুরিয়া উপজেলায় চাঁদাবাজি, দোকান ভাঙচুর ও সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল ও জামায়াত মনোনীত এবং ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি অভিযোগ করেন, যারা ৫ আগস্টের পর ডুমুরিয়ায় চাঁদাবাজি ও ভাঙচুর চালিয়েছে, তারাই এখন আবার সংখ্যালঘুদের কাছে গিয়ে নিরাপত্তা দেয়ার নামে ভোট চাইছে। তিনি বলেন, চাঁদা, কার্ড আর মিথ্যার রাজনীতি দিয়ে বাংলার মানুষকে আর বোকা বানানো যাবে না।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) দিনব্যাপী খুলনা-৫ আসনের ডুমুরিয়া উপজেলার শলুয়া বাজার, গজেন্দ্রপুর, রামকৃষ্ণপুর, চুকনগর বাজার, আন্দুলিয়া ও কৃষ্ণনগরে পৃথক গণসংযোগ, নির্বাচনী জনসভা ও মিছিলে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সেক্রেটারি ডা. হরিদাস মন্ডলের সভাপতিত্বে ও তরুণ সরদারের পরিচলনায় উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম ও অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, কাইয়ুম আল ফয়সাল, মো. আশরাফ হোসেন, তরুন কুমার সরদার, অধ্যাপক শাহীন হোসেন, প্রশন্ন বিশ্বাস, বিধান ঢালী, মো. নজরুল ইসলাম, তাজকিয়াতুল আউরিয়া, রফিকুল ইসলাম, আব্দুল গফ্ফার, তাপস কুমার হালদার, শক্তি রায়, উজ্জ্বল ঢালী, অবনিশ, অমিত কুমার, বুদ্ধদেব প্রমুখ।

শলুয়া বাজার থেকে রংপুর ইউনিয়ানের জগেন্ত্রনাথ মন্ডল বাড়িতে হিন্দুধর্মালম্বীদের নিয়ে উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উঠান বৈঠকে ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সেক্রেটারি ডা. হরিদাস মন্ডলের সভাপতিত্বে তরুণ সরদারের সঞ্চালনায় হিন্দু কমিটির নেতারা ছাড়াও বক্তৃতা করেন সাধারণ হিন্দু ভোটাররা। সেখান থেকে দুপুর ১টায় রামকৃষ্ণপুর এলাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাথে পথসভায় অংশ নেন।

এদিকে বিকেল ৪টায় ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের উদ্যোগে চুকনগর বাজারে নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। আটলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারি সেক্রেটারি মুন্সি মইনুল ইসলাম ও অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, ইসলামী ছাত্রশিবিরের খুলনা জেলা সভাপতি ইউসুফ ফকির, আব্দুল কাইয়ুম আল ফয়সাল, খেলাফত মজলিসের ডুমুরিয়া উপজেলা সভাপতি মাওলানা শরিফুল ইসলাম, জামায়াত নেতা ইকরাম হোসেন সুমন, মাওলানা মোস্তাক, গাজী সাইফুল্লাহ, হিন্দু কমিটির সেক্রেটারি ডা. হরিদাস মন্ডল, মাওলানা ইউসুফ ফরহাদ, মাহমুদুল হাসান, ইকরাম হোসেন প্রমুখ।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, রাস্তার পাশে বাদাম বিক্রি করে, ছোটখাটো দোকানদারি করে এমন মানুষের কাছ থেকেও চাঁদা তোলা হয়েছে। ৫ আগস্টের পরে ডুমুরিয়ায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজি হয়েছে। প্রশ্ন হলো কারা করেছে? তিনি বলেন, ওই সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। ৫ তারিখের পরে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। আওয়ামী লীগ তখন ছিল না। তাহলে দোকান ভাঙচুর, চাঁদাবাজি কারা করলো? এই প্রশ্ন কি আমরা করতে পারি না?

সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ করে তিনি বলেন, বহু হিন্দু ব্যবসায়ী আমাকে ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। অনেকে আমাকে ফোন করে বলেছে দাদা, আমার দোকানে এসে ১০ লাখ টাকা নিয়ে গেছে, দোকান ভেঙে দিয়েছে। এরা কারা?

ডুমুরিয়ার বাস্তবতা তুলে ধরে সাবেক এই এমপি বলেন, ডুমুরিয়া হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এখানে লক্ষাধিক হিন্দু ভোটার রয়েছে। নারী ও শিশুসহ প্রায় তিন লাখ হিন্দু এই আসনে এলাকায় বসবাস করে। আমি জেল থেকে বের হয়েই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।

নিজের কারাবাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমি সাড়ে সাত বছর জেল খেটেছি। ৫ আগস্টের পরদিন, ৬ আগস্ট আমি কারাগার থেকে মুক্তি পাই। তখনই খবর পেলাম এলাকায় আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, দুর্গাপূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি নিজেই দলীয় নেতাকর্মীদের মাঠে নামান। আমি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে বলেছি তোমরা যাও, পাশে দাঁড়াও, যাতে কেউ ভয় না পায়। আমি নিজে ফোন করে ডুমুরিয়া, চুকনগর, রংপুর, শাহপুর, শোভনাসহ বিভিন্ন জায়গার খোঁজ নিয়েছি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, যারা দোকান ভাঙে, চাঁদা তোলে তারাই এখন এসে হিন্দুদের বলছে, ‘আমরা আপনাদের নিরাপত্তা দেবো, আপনারা আমাদের মার্কায় ভোট দেন। আমি অবাক হই! চাঁদাবাজরা আবার নিরাপত্তার ঠিকাদার!

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই চাঁদা কি জামায়াতে ইসলামীর লোকেরা তোলে? না! বাজারে বাজারে, রাস্তার পাশে ছোট দোকানিদের কাছ থেকে যারা চাঁদা তুলেছে তারা কারা, সেটা জনগণ জানে।

এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রতারণার অভিযোগ তোলেন জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা। তার ভাষায়, আরেক প্রতারণার ফাঁদ পাতা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড সবই ভুয়া।

তিনি বলেন, এলাকায় কার্ড বিতরণের ভিডিও প্রমাণ তিনি সরাসরি নির্বাচন কমিশনার ও কমিশন সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করেছি এটা কি নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন নয়? আচরণবিধিতে স্পষ্ট বলা আছে, নির্বাচনের আগে কোনো দল বা প্রার্থী জনগণকে অনুদান বা লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে না।

তার অভিযোগ, কার্ড দেখিয়ে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। কেউ বলছে ৪ হাজার টাকা, কেউ বলছে ২০ বা ২১ হাজার টাকা। কেউ বলছে চাল-গম, তেল-রেশন। আসলে কী দেবে কেউ জানে না। পুরোটাই ভুয়া।

তিনি বলেন, দেশে মানুষ ১৮ কোটি, আর তারা বলছে ৫০ কোটি কার্ড দেবে! মিথ্যার ওপর মিথ্যা, ডবল মিথ্যা।

নারী ভোটারদের টাকা দেয়ার অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কিছু কিছু এলাকায় মহিলাদের গিয়ে টাকা দেয়া হচ্ছে। আবার কিছু লোক ঘুরে ঘুরে বলছে ভাই, আমি অমুক জায়গা থেকে এসেছি, তুমি ভোট দিও। মানুষ টাকা নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সব বোঝে।

নিজেদের রাজনীতির তুলনা টেনে তিনি বলেন, আজ যারা এই সভায় এসেছে তাদের কাউকে আমরা টাকা দেইনি। মানুষ নিজের পয়সায় ভ্যান ভাড়া দিয়ে এসেছে। কারণ তারা জানে, এই লড়াই ন্যায় ও ইনসাফের।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই ডুমুরিয়া-ফুলতলা অতীতে চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীরা আমাদের শান্তি কেড়ে নিয়েছিলো। সন্ধ্যার আগে মানুষ বাড়িঘরে ফিরে যেতো। সকাল হলে ভয় হতো, কালকে কার মৃত্যুর খবর শুনবো। আমি তখন এমপি হয়ে সন্ত্রাস নির্মূলের চেষ্টা করেছি। সন্ত্রাস ও চরমপন্থী নির্মূল করতে গিয়ে আমাকে চিঠি দিয়ে মৃত্যুর হুমকি দেয়া হতো। আমি জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে ডুমুরিয়ার ১৪টি ইউনিয়ন তখন চরমপন্থিমুক্ত করেছিলাম। গত ২০ বছর আমি না থাকায় আবারো ওই সন্ত্রাসীরা মাথাচাড়া দিচ্ছে। আপনাদের সাথে নিয়ে আমরা আবার এই ডুমুরিয়া চরমপন্থী সন্ত্রাসী মুক্ত করব ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, বিল ডাকাতিয়ার মানুষের দুঃখ আমি বুঝি, কারণ আমি বিল ডাকাতিয়ার একজন কৃষকের সন্তান। এই বিল জলাবদ্ধ হয়ে বাড়ি ঘরে পানি উঠলে সেই পানির ভোগান্তিতে আমিও পড়ি। আর আমার বন্ধু এখন আপনাদের কাছে এসে বলে সব ঠিক করে দিবানি। তিনি জানেনও না এখানে কোথায় কি সমস্যা। শুধু দুর্নীতির টাকা নিয়ে মানুষের ভোট কিনতে চায়, ভোট কেন্দ্র দখল করে সংসদে যেতে চায়। কিন্তু সেই দিন আর নেই। মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তাই দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পেতে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।