রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ডিজেল সঙ্কটের কারণে কৃষকরা তাদের সেচ পাম্প চালাতে পারছেন না, ফলে বোরো ধানসহ অন্য ফসলি জমি শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) সকালে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল নিতে সেচপাম্প নিয়ে কৃষকদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, ‘এলাকায় যে কয়টা দোকান, সব বন্ধ। শহরে এসেও কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি। এই যে দেখেন, ড্রাম খালি। গাড়িআলারা তেল পাচ্ছে, আমরা কৃষকরা পাচ্ছি না। আমরা তো আর তেল নিয়ে নষ্ট করি না।’
এখন বোরো ধানের ভরা মৌসুম। বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর। ফেব্রুয়ারি থেকে মে-এই সময়ে জমিতে নিয়মিত এক দিন পরপর সেচ দিতে হয়। এলাকাভেদে ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত বোরো ধানের চাষাবাদ হলেও ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ক্ষেত পুরোপুরি সেচনির্ভর থাকে।
উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৯৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে নয় হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। উপজেলায় ডিজেলচালিত সেচপাম্প ২০১৭২, বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ ২১৭, বিদ্যুৎচালিত অগভীর নলকূপ ১৫৫৩টি সেচপাম্প রয়েছে। তবে পেট্রল চালিত সেচপাম্পের তালিকা করা হয়নি বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা।
ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল নিতে সেচপাম্প নিয়ে কৃষকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। তাদের অনেকেই পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
কৃষকরা জানায়, মোটরসাইকেলে জ্বালানি তেল নিতে ‘জ্বালানি কার্ড’ চালু করা হলেও কৃষকদের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ সময় বোরো ও ভুট্টা চাষের জন্য জমিতে সেচ দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু, বোতল বা আলাদাভাবে জ্বালানি তেল সংগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়ায় অনেক চাষি সেচপাম্প নিয়েই ফিলিং স্টেশনে এসেছেন। তবে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিং স্টেশনে আসা বোরো চাষিরা বলেন, সব কাজ ছেড়ে দিয়ে আট থেকে ১০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। মোটরসাইকেল আরোহীদের কথা চিন্তা করলেও কৃষকদের কথা কেউ ভাবেনি। এতে জমির ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় পড়েছি। কিছু পাম্পে দেড়শ টাকার জ্বালানি তেল দিলেও সেটা আমাদের জন্য অপ্রতুল। দৈনিক আমাদের ১০ থেকে ১৫ লিটার জ্বালানি তেলের প্রয়োজন। আমরাও বিশেষ জ্বালানি কার্ডের দাবি জানাচ্ছি।
ধর্মগড় ইউনিয়নের কৃষক আবু তাহের বলেন, ‘দেশে কি সত্যি জ্বালানি সঙ্কট, নাকি বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হচ্ছে বুঝছি না। সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সঙ্কট নেই; অথচ পাম্পে গেলে তেল পাওয়া যাচ্ছে না।’
রাণীশংকৈল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি সঙ্কটের কারণে সেচে সমস্যা হলে কৃষিতে খারাপ প্রভাব পড়বে। কোনো কৃষক যদি আমাদের কাছে আসেন, আমরা তাকে আবেদন ফরম পূরণ করার মাধ্যমে প্রত্যয়নপত্র দেবো-এর মাধ্যমে তিনি জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবেন।’
কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রত্যায়নপত্র পাওয়ার সুযোগের বিষয়টি জানা নেই বলে জানিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের চাষিরা। তারা বলছেন, এমন বিষয়ে কোনো প্রকার প্রজ্ঞাপন বা মাইকিং করে কৃষকদের জানানো হয়নি।
রাতোর এলাকার কৃষক আমির হোসেন বলেন, ‘প্রত্যায়নপত্রের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পেলে তো কষ্ট করে সাথে পাম্প নিয়ে আসতে হয় না। এটা এই প্রথম শুনলাম।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা বেগম বলেন, ‘কৃষকদের বিষয়ে আমরা কাজ করছি। ইতোমধ্যে রাণীশংকৈল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরকে জানানো হয়েছে। তারা প্রত্যায়নপত্র দিলে কৃষকরা জ্বালানি নিতে পারবেন। দ্রুতই বিষয়টি কৃষকদের জানানোর জন্য প্রচারের ব্যবস্থা করব।’
ঠাকুরগাঁওয়ে বর্তমানে ৩৮টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে, সদর উপজেলায় ২৪টি, বালিয়াডাঙ্গীতে দুইটি, হরিপুরে দুইটি, রাণীশংকৈলে ছয়টি এবং পীরগঞ্জে রয়েছে চারটি ফিলিং স্টেশন।



