শুধু মাত্র অর্থের অভাবে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে জোড়া লাগা ফুটফুটে দু’টি প্রাণ নিভে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। টাকার অভাবেই যমজ মেয়ে শিশু জয়নব ও উম্মে কুলসুমের নতুন জীবনের স্বপ্ন এখন দারিদ্র্যের কাছে হার মানতে যাচ্ছে। পরিবারটি সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তিদের নিকট আকুতি জানিয়েছেন।
খুশির খবর হলো— বুক থেকে পেট পর্যন্ত একসাথে যুক্ত এই দুই শিশুকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করার সম্ভাবনা দেখছেন দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসকেরা। তবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্য না থাকায় নির্ধারিত সময়েও তাদের ঢাকায় নেয়া সম্ভব হয়নি।
দূর থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ দুই মেয়ে শিশু। কিন্তু কাছে গেলেই চোখ আটকে যায়। বুক থেকে পেট পর্যন্ত একসাথে জোড়া লাগানো যমজ বোন জয়নব ও উম্মে কুলসুম। জন্মের পর থেকেই তাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি নড়াচড়া যেন একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। একজন কাঁদলে অন্যজনও কেঁদে ওঠে, একজন নড়লে অন্যজনও ব্যথায় কুঁকড়ে যায়।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া গ্রামের বাসিন্দা নাহিদ হাসান ও সানজিদা আক্তার দম্পতির ঘরে গত ৪ মে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয় এই বিরল যমজ শিশুর।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, চিকিৎসকরা আশা দিয়েছেন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশু দু’টিকে আলাদা করা সম্ভব হতে পারে। তবে তার আগে প্রয়োজন একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত চিকিৎসা। জম্মের তিন মাস পর আবার ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হলেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে যেতে পারেনি পরিবারটি।
জানা যায়, শিশুদের বাবা নাহিদ হাসান একসময় ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। বর্তমানে সে স্থানীয় দোকানে কর্মচারি হিসেবে কর্মরত। নয় থেকে ১০ হাজার টাকার বেতনে সংসার চালাতে যেখানে ব্যর্থ সেখানে শিশুর ব্যয় বহুল চিকিৎসা চালাতে কল্পনাতিত। এদিকে শিশুদের দুধ, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝাও বেড়েছে এই পরিবারের ওপর।
শিশুদের পিতা নাহিদ হাসান বলেন, ‘ঢাকার চিকিৎসকরা আশ্বাস দিয়েছেন তাদের আলাদা করা সম্ভব। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য আমার নেই। এখন তাদের দুধ এবং ওষুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
শিশুদের মা সানজিদা বলেন, ‘ওদের আলাদাভাবে কোলে নেয়া যায় না। একজন নড়াচড়া করলে অন্যজন কষ্ট পায়। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ঢাকায় যেতে হবে, কিন্তু যাতায়াত ও পরীক্ষার খরচ জোগানোর সামর্থ্য আমাদের নেই।’
স্থানীয়রা বলেন, এই দুই শিশুকে বাঁচাতে হলে সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি। সবার সহযোগিতা পেলে হয়তো ওরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে।
এ ব্যাপারে প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল বলেন, ‘পরিবারটি অত্যন্ত অসচ্ছল। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে শিশু দু’টির চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা চাওয়া হবে।’
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা; তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, ‘চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। যথাসময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে থাকলে শিশু দু’টির চিকিৎসার সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল হবে।’
এ ব্যাপারে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, শিশু দু’টির চিকিৎসায় উপজেলা সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে দ্রুত আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার চেষ্টা করছি।’
শিশু জয়নব ও উম্মে কুলসুমকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে মানবিক সহযোগিতা জরুরি প্রয়োজন। আর সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতাই হতে পারে তাদের নতুন জীবনের আশার আলো।



