২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরের সেই ভয়ানক ও রক্তাক্ত রাত। সময়ের ব্যবধানে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ১৩ বছর। কিন্তু সেই রাতের ক্ষত আজও বহন করে চলেছেন সিলেটের আলেম মাওলানা মনসুর আহমদ আসজাদ। একাধিক অস্ত্রোপচারের পরও তার শরীরে এখনো রয়ে গেছে গুলির অংশ।
সর্বশেষ গত ১ মে তৃতীয়বারের মতো অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে তিনি সিলেটের একটি ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, হেফাজতে ইসলামের ডাকে আয়োজিত শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশে সিলেটের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামেয়া রেঙ্গার পক্ষ থেকে অংশ নেন মাওলানা মনসুর আসজাদ। দিনভর দোয়া, জিকির ও বয়ানের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান চলছিল। কিন্তু গভীর রাতে হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে যায়।
রাত প্রায় ২টার দিকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চারদিক অন্ধকারে ডুবে যায়, শুরু হয় আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা। এ সময় হঠাৎ কে বা কারা গুলি ছুড়লে গুলি এসে তার পিঠে আঘাত হানে। প্রথমে তিনি কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই অনুভব করেন তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এসময় তার পায়েও গুলি লাগে। চারদিক থেকে গুলির শব্দ, চিৎকার আর ছুটোছুটির মধ্যে শুরু হয় এক বিভীষিকাময় অবস্থা।
রক্তাক্ত অবস্থায় অন্যদের সহযোগিতায় তিনি যাত্রাবাড়ীর একটি মাদরাসায় আশ্রয় নিতে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হয়ে সেখানেই অবস্থান করতে বাধ্য হন। পরে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে ফেরেন। এরপর ধাপে ধাপে একাধিক অস্ত্রোপচার করা হলেও শরীর থেকে সব গুলি অপসারণ সম্ভব হয়নি।
পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং আরোগ্য পলি ক্লিনিকে ডা: রাশেদুন্নবী খাঁনের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচার করেন।
পরে আবার মেরুদণ্ডে অপারেশন করতে হয়। দীর্ঘদিন কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও ২০২৫ সাল থেকে পুনরায় জটিলতা বাড়তে থাকে। সর্বশেষ চলিত ২০২৬ সালের ১ মে সিলেট ট্রমা সেন্টারে তার তৃতীয় দফা অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
মাওলানা মনসুর আহমদ আসজাদ সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ছিলিমপুর পূর্ব ভাদেশ্বর এলাকার বাসিন্দা। তিনি মরহুম মাওলানা নিজাম উদ্দিনের ছেলে এবং জামেয়া ইসলামিয়া দারুস সুন্নাহ রাউতকান্দির সাবেক শিক্ষক।
তিনি জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা সিলেট থেকে তাকমিল ফিল হাদিস সম্পন্ন করেন।
এদিকে, সহপাঠী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, শাপলার সেই ঘটনার একজন প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত তিনি কোনো সরকারি তালিকায় স্থান পাননি। এমনকি হেফাজতে ইসলাম বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ থেকেও তার খোঁজখবর নেয়া হয়নি।
তার কয়েকজন সহপাঠী নয়া দিগন্তকে জানান, যে মানুষটি একদিন ময়দানে দাঁড়িয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, আজ তিনি নীরবে কষ্ট সহ্য করছেন। তার পাশে দাঁড়ানোর মতো তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয়রা মাওলানা মনসুর আসজাদের দ্রুত সুস্থতা কামনার পাশাপাশি, তাকে শাপলার আহতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবি জানান।



