পানিশূন্য পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ এখন মশার প্রজননকেন্দ্র

নদী দখল করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

‘শহরের পরিবেশ রক্ষায় শহরের কোল ঘেঁষে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদটি পরিষ্কার-পরিছন্নতা ও খননেন উদ্যোগ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। আগাছা পরিষ্কার ও খনন করলে দীর্ঘ প্রায় সাত কিলোমিটার খালের মাধ্যমে স্বচ্ছ পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে বিশাল আকৃতির এই খাল (পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ) জামালপুর শহরের জন্য আর্শিবাদ হতে পারে।’

খাদেমুল বাবুল, জামালপুর

Location :

Jamalpur
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্মিত সেতু
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্মিত সেতু |নয়া দিগন্ত

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই জামালপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়সহ জেলার বেশিরভাগ অফিসের অবস্থান। এখানে আছে জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ২৫০ শয্যার জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল, সার্কিট হাউজ, সিভিল সার্জনের বাসভবন, জেলা প্রশাসকের বাসভবন, সুপার ও জেলা ও দায়রা জজের বাসভবনসহ অনেক স্থাপনা।

কিন্তু শহরের তীর ঘেঁষে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ যেন মশা প্রজননের এক কারখানায় পরিণত হয়েছে। জেলা প্রশাসনসহ জেলার প্রায় সবগুলো অফিসের সামনে এমন অস্বাস্থ্যকর বিরাজ করলেও দেখার যেন কেউ নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৯০-এর দশকে জামালপুর জেলার ওইসব গুরুত্বপূর্ণ অফিস ও স্থাপনাসহ জামালপুর শহর ও অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের মুখে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য স্থাপনা নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য নদী শাসনের পরিবর্তে শহরতলীর গুয়াবাড়ি এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের মোহনায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পরিবর্তন করে দেয়া হয় নদের গতিপথ। ফলে এক সময়ের খরস্রোতা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ এখন মরাখাল ও মশা প্রজনন কারখানায় পরিণত হয়েছে।

শহরের যত ময়লা পানি, মৃত প্রাণীর মরদেহ পচে-গলে দুর্গন্ধ আর আগাছার-জঙ্গলে মশা প্রজনন কেন্দ্র সৃষ্টি হয়েছে। তবে ওই মশা প্রজনন কেন্দ্রের ওপর একটি বেসরকারি (প্রাইভেট) বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আট কোটি ৪২ লাখ ৩৫ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে নজর কাড়া দৃষ্টিনন্দন সেতু।

জামালপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়। সেতু নির্মাণে বরাদ্দ সাত কোটি ২২ লাখ ৯১ হাজার টাকা হলেও সেতু নির্মাণে চুক্তি করা হয় আট কোটি ৪২ লাখ ৩৫ টাকা। চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালে ৬০ মিটার এই সেতুটি নির্মাণ করে।

স্থানীয়রা জানান, পতিত সরকারের আমলে ব্রহ্মপুত্র নদের চর দখল করে নির্মাণ করা হয় শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। ৫ আগস্টের পর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করা হয়।

এলাবাসীর অভিযোগ, ব্রহ্মপুত্র নদের জমি দখল করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। দিনে ২০০ মানুষও পারাপার হয় না এ সেতু দিয়ে। তাদের ভাষায় ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট। অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা খরচ করে সেতু নির্মাণ করা হলেও নিচে শহরের বর্জ্য ফেলে ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদকে। পানি প্রবাহ বন্ধ থাকায় আগাছা জন্মে মশা সৃষ্টির কারখানায় পরিণত হয়েছে।

জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘শহরের পরিবেশ রক্ষায় শহরের কোল ঘেঁষে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদটি পরিষ্কার-পরিছন্নতা ও খননেন উদ্যোগ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। আগাছা পরিষ্কার ও খনন করলে দীর্ঘ প্রায় সাত কিলোমিটার খালের মাধ্যমে স্বচ্ছ পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে বিশাল আকৃতির এই খাল (পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ) জামালপুর শহরের জন্য আর্শিবাদ হতে পারে।’

পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের এই নেতা আরো বলেন, ‘মরাখালের পরিণত এই পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে নদকে স্রোতধারার সাথে সংযুক্ত করা হলে জামালপুর হতে পারে একটি পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন শহর।’

পাশাপাশি তিনি ব্রহ্মপুত্র নদের চর দখল করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেন।

এদিকে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মো: মনিরুজ্জামান বলেন, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে নদের মূল স্রোতধারার সাথে সংযুক্ত করা হলে শহরের ভূগর্ভস্থ পানিস্তর স্বাভাবিক থাকবে।