দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার পরিচয়ে এমপি প্রার্থীর নিকট টাকা দাবি, গ্রেফতার ২

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন এমপি প্রার্থীর মোবাইল নাম্বারে দিনাজপুর পুলিশ সুপারের পরিচয় দিয়ে একটি নির্মাণ কাজের জন্য টাকা দাবি করা হয়।

সাদাকাত আলী খান, দিনাজপুর

Location :

Dinajpur
দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার পরিচয়ে এমপি প্রার্থীর নিকট টাকা দাবি, গ্রেফতার ২
দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার পরিচয়ে এমপি প্রার্থীর নিকট টাকা দাবি, গ্রেফতার ২ |নয়া দিগন্ত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন এমপি প্রার্থীর মোবাইল নাম্বারে দিনাজপুর পুলিশ সুপারের পরিচয় দিয়ে একটি নির্মাণ কাজের জন্য টাকা দাবি করা হয়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে দিনাজপুর পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ বিষয় তদন্তপূর্বক পুলিশ পরিচয় এর দাবি করা ২ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

জানা গেছে, দিনাজপুর-৪ (খানসামা ও চিরিরবন্দর) আসনের বিএনপি মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী আক্তারুজ্জামান মিয়ার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে গত ১ জানুয়ারি থেকে একটি প্রতারক চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার মো: জেদান আল মুসা, পিপিএম এর পোশাক পরিহিত ছবি সংবলিত ভুয়া প্রোফাইলের মাধ্যমে একাধিকবার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ করে।

এ সময় অভিযুক্ত প্রতারকরা নিজেদের পুলিশ সুপার দিনাজপুর পরিচয় দিয়ে জানায় যে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে চিরিরবন্দর থানা এলাকায় দুইটি স্টিল নির্মিত পুলিশ বুথ স্থাপন করা হবে যার একটি ঘুঘুরাতলীতে এবং অন্যটি সুবিধাজনক স্থানে।

তারা আরো জানায়, ওই বুথ নির্মাণের জন্য জেলা পুলিশ একজন ঠিকাদার নিয়োগ করেছে এবং প্রতি বুথ নির্মাণ বাবদ ৮৫ হাজার টাকা হিসেবে মোট ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ও আনুষঙ্গিক খরচসহ সর্বমোট ২ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে। ওই অর্থ ডোনেশন হিসেবে প্রদান করে পুলিশকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হয়। এই প্রেক্ষিতে প্রতারকরা হোয়াটসঅ্যাপ দুইটি বিকাশ নম্বর পাঠায়। পরবর্তীতে দিনাজপুর-৪ আসনের বিএনপির এমপি প্রার্থী আক্তারুজ্জামান মিয়া ২ জানুয়ার-২০২৬ খ্রি: বিকাল ১৫.৫৫ মিনিটে ঘুঘুরাতলীর একটি বিকাশ অ্যাজেন্টের দোকান থেকে ওই দুইটি নম্বরে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা প্রেরণ করেন।পরবর্তীতে সন্ধ্যার পর আবার একই ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অবশিষ্ট ১ লাখ টাকা দ্রুত পাঠানোর জন্য তাগিদ দেয়া হলে এমপি প্রার্থীর সন্দেহ হয়। এরপর পূর্বে দেয়া বিকাশ নম্বরসমূহে যোগাযোগের চেষ্টা করলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আর কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

ওই ঘটনায় ভুক্তভোগীর পক্ষে ৫ নম্বর আব্দুলপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো: ইমরান হোসেন গত ৫ জানুয়ারি- ২০২৬ খ্রি. চিরিরবন্দর থানায় অজ্ঞাতনামা প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে একটি এজাহার দায়ের করেন। এজাহারের ভিত্তিতে চিরিরবন্দর থানার মামলা নম্বর-০২/২০২৬, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ২১/২২/২৪/২৭ ধারায় মামলা রুজু করা হয়। পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তভার জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), দিনাজপুর-এর নিকট ন্যস্ত করা হয়।

মামলার রহস্য উদঘাটন করে জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি বিশেষ ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ঘটনার সাথে জড়িত দুইজন প্রতারক আটককৃত হলেন, নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার রয়েরবাড়ি চর হোসেনপুর গ্রামের আম্বিয়া আক্তার ও মৃত ইদ্রিস খন্দকারের পুত্র জুনাইদ খন্দকার (২৪) এবং ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানার চরহোসেনপুর গ্রামের হুসনারা ও আরশাদ আলীর ছেলে মো: হিমেল (২২) গ্রেফতারের সময় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৩টি মোবাইল ফোন, ৫টি সিমকার্ড এবং নগদ ১,৪৮,১৩৫/- টাকা উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়।জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার আসামিরা জানায়, তারা নিজেদের দিনাজপুর জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা তথা এসপি পরিচয় দিয়ে বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে। তারা বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ‘পুলিশ কন্ট্রোল রুম’-এর নম্বর সংগ্রহ করে এসপি পরিচয়ে কল দিয়ে প্রতারণা করত। গ্রেফতার আসামিরা ওই প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে ৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার বেলা দুপুরে দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আনোয়ার হোসেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন জানান, প্রতারক চক্রটি দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের দুইজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শিল্পপতি দিনাজপুর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি হাফিজুর রহমান সরকার ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৪(চিরিরবন্দর খানসামা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আখতারুজ্জামান মিয়ার কাছে নিজেদেরকে পুলিশ সুপার জেদান আল মুসার পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করে। তারা নির্বাচনকালীন সময়ে দিনাজপুর-চিরিরবন্দর সড়কে পুলিশ বক্স স্থাপন করা হবে-এমন ভুয়া আশ্বাস দিয়ে বিকাশের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে ক্ষতিগ্রস্ত তারা বিষযটি পুলিশ সুপারকে অবহিত করেন।

এরপর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অভিযানে নামে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গাজীপুর ও ময়মনসিংহ থেকে প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।

তিনি আরো বলেন, এই চক্রটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। এরা সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদেরও টার্গেট করে। মোবাইল ফোনে ভয়ভীতি প্রদর্শন, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মিথ্যা আশ্বাসসহ নানা কৌশলে তারা লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন আরো জানান, সম্প্রতি সময়ে এই প্রতারক চক্র দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে প্রতারণা চালানোর পরিকল্পনাও করছিল।