শিক্ষা বোর্ড-কেন্দ্র সচিবের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

ভুল প্রশ্নে এইচএসসি পরীক্ষা : অনিশ্চয়তায় ১০০ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ

জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে ১০০ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়ার ঘটনায় দায় এড়াতে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড ও কেন্দ্র সচিবের মধ্যে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।

ময়মনসিংহ অফিস

Location :

Mymensingh
জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ
জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ |নয়া দিগন্ত

জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে ১০০ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়ার ঘটনায় দায় এড়াতে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড ও কেন্দ্র সচিবের মধ্যে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। একপক্ষ পুরো দায় কেন্দ্রের ওপর চাপাতে চাইছে, অন্যপক্ষ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে দায়ী মানতে রাজি নয়। অথচ এ দুই পক্ষের দায় ঠেলাঠেলির মাঝখানে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে ১০০ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

গত শনিবার অনুষ্ঠিত এইচএসসি বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় নিয়মিত ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের একটি কক্ষে ভুলবশত ২০২৫ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। পরীক্ষার্থীরা প্রশ্ন হাতে পেয়েই সিলেবাস ও সালের অসঙ্গতি ধরতে পারলেও অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করার পরিবর্তে তাদের পরীক্ষা চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বলেন, "যা পারো লেখো, কোনো কথা বলা যাবে না।" ফলে বাধ্য হয়েই ১০০ শিক্ষার্থী ভুল প্রশ্নেই পরীক্ষা সম্পন্ন করে।

ঘটনার পর কেন্দ্র কমিটি বাতিল এবং অধ্যক্ষ শওকত আলী মীরকে কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হলেও তিনি দায় স্বীকার করেননি। তার দাবি, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কাউকে দোষী বলা ঠিক হবে না। তদন্তেই প্রকৃত দায় নির্ধারণ হবে।

অন্যদিকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আবু খায়ের মো: কামাল হাসান দাবি করেছেন, এ ঘটনায় শিক্ষা বোর্ডের কোনো দায় নেই। কিন্তু বোর্ডের এমন বক্তব্যের পরই নতুন করে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন।

বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই কেন্দ্রে ২০২৫ সালের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৫ জন। অথচ ওই কোডের ১০০টি প্রশ্নের একটি অতিরিক্ত খাম কেন্দ্রে কীভাবে গেল, সেটির সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি বোর্ড। প্রশ্ন উঠেছে—ভুলটি কি বিজি প্রেসে প্যাকেট তৈরির সময় হয়েছে, নাকি বোর্ড থেকে বিতরণের সময়? অতিরিক্ত ১০০টি প্রশ্ন কেন্দ্রে পৌঁছাল কীভাবে? এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর নেই।

বোর্ড জানিয়েছে, ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়া শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র আলাদা করে বোর্ডে আনা হয়েছে এবং সেগুলো পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। তবে কী নীতিমালার ভিত্তিতে সেই মূল্যায়ন হবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের আশঙ্কা, ভিন্ন সিলেবাসের প্রশ্নে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হলে অন্য পরীক্ষার্থীর সাথে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। আবার কোনো সুবিধা না দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ওই ১০০ শিক্ষার্থী। ফলে যে সিদ্ধান্তই নেয়া হোক, সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শিক্ষা বোর্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রশ্নপত্র পরিবহন ও সংরক্ষণে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আফসানা তাসলিম বলেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ শুধু নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন এনে ট্রেজারিতে রাখা হয় এবং পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তা বুঝে নেয়। কোথায় ভুল হয়েছে, তা তদন্তেই বের হবে।

ঘটনার তদন্তে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম কমিটির প্রধান হলেও এখনও চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।

শিক্ষাবিদ স্বপন ধর বলেন, শুধু কেন্দ্র সচিবকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রশ্নপত্র প্রস্তুত, সংরক্ষণ, বিতরণ ও তদারকির পুরো ব্যবস্থায় কোথায় ব্যর্থতা হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটবে এবং শিক্ষার্থীরাই বারবার বলির পাঁঠা হবে।

এদিকে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এনামুল হক বলেছেন, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রশ্ন একটাই—দোষীকে, সেটি পরে নির্ধারণ হলেও ১০০ শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস, মানসিক চাপ ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার দায় নেবে কে? বোর্ড ও কেন্দ্রের দায় এড়ানোর এই সংস্কৃতি শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়েই নতুন করে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।