বাস-মাইক্রোবাসের মুখোমুখী সংঘর্ষ

লাল শাড়ি আর মেহেদী রাঙা হাতে নববধূ ফিরলেন লাশ হয়ে

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার (১৩ মার্চ) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তিনজনের লাশ তাদের বাড়িতে পৌঁছায়। সকাল ১০টায় উত্তর নাকশা গ্রামে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা

Location :

Khulna
স্বজনদের আহাজারি, (ডানে) নিহত তিনজনের জানাজা নামাজের মুহূর্ত
স্বজনদের আহাজারি, (ডানে) নিহত তিনজনের জানাজা নামাজের মুহূর্ত |নয়া দিগন্ত

লাল শাড়ি আর মেহেদী রাঙা হাতে যে নববধূ হাসিমুখে বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, সেই নববধূই ফিরলেন লাশ হয়ে। গতকালও নবদম্পতিকে ঘিরে খুনসুটি আর আনন্দে মুখর ছিল কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকশা গ্রামের সালাম মোড়লের বাড়ি। কিন্তু বিকেল গড়াতেই সেই বাড়িজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া, চারপাশে ভেসে ওঠে স্বজনদের কান্না।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নববধূসহ একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে।

একই পরিবারের তিন নিহত হলেন— খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের সালাম মোড়লের মেয়ে নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু (১৮), তার ছোট বোন লামিয়া (১১) ও তাদের দাদি রাশিদা বেগম (৭৫)। এছাড়া এ দুর্ঘটনায় নববধূর নানী আনোয়ারা খাতুনও নিহত হয়েছেন।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার (১৩ মার্চ) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তিনজনের লাশ তাদের বাড়িতে পৌঁছায়। সকাল ১০টায় উত্তর নাকশা গ্রামে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। হাফেজ আবু বকর ছিদ্দিকের ইমামতিতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।

জানা গেছে, গত বুধবার (১১ মার্চ) রাতে নাকশা গ্রামের সালাম মোড়লের মেয়ে মিতুর সাথে রামপাল এলাকার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সাব্বির হোসেনের বিয়ে হয়। বৃহস্পতিবার সকালে নববধূ মিতু তার ছোট বোন লামিয়া ও দাদি রাশিদা বেগমকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। পথে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বোলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে মংলা থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সাথে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসে থাকা নববধূ, বর ও তাদের স্বজনসহ ১৪ জন নিহত হন।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নাকশা গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়িতে স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

শুক্রবার সকালে নববধূর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা আবদুস সালাম শোকে ভেঙে পড়েছেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বলছিলেন, ‘আমার মেয়েরা কোথায়, আমি তাদের একবার দেখব।’ তার আহাজারিতে উপস্থিত সবার চোখে পানি এসে যায়। নিজের দুই মেয়ে ও মায়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তিনি।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সালামের বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। মা, দুই মেয়ে ও একমাত্র ছেলে ইসমাইলকে ঘিরেই ছিল তার সব স্বপ্ন। দুর্ঘটনার সময় ছোট ছেলে ইসমাইলও মাইক্রোবাসে উঠতে চেয়েছিল। কিন্তু জায়গা না থাকায় তাকে নামিয়ে দেয়া হয়। পরে সকালে তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

নববধূর মা মুন্নি খাতুনের অবস্থাও খুবই শোচনীয়। দুই মেয়ে ও শাশুড়ির লাশ বাড়িতে আনার পর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মাঝে মাঝে চোখ খুললেও কিছু বলতে পারছেন না। এলাকাবাসী তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। এ দুর্ঘটনায় মুন্নি খাতুনের মা, অর্থাৎ নববধূর নানী আনোয়ারা খাতুনও নিহত হয়েছেন। তার লাশ দাকোপ উপজেলার পানখালী গ্রামে নেয়া হয়েছে।

নিহত নববধূর চাচা মোফেজ মোড়ল বলেন, ‘এতো বড় শোক সইবার মতো শক্তি তাদের পরিবারের নেই। ভাষায় এ শোক প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’

নাকশা ডিএফ আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম জানান, নিহত মিতু তার মাদরাসার আলিম শেষ বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তার সরলতা ও ভদ্র আচরণে শিক্ষকসহ সবাই মুগ্ধ ছিলেন। তাকে হারিয়ে শিক্ষকরা গভীরভাবে শোকাহত।

আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জুয়েল বলেন, এর আগে তার ইউনিয়নে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেনি। পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

কয়রা থানার ওসি (তদন্ত) মো: শাহ আলম বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে নিহতদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং নাকশা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।