একসময় যে স্থানে ছিল গ্রামবাসীর চলাচলের জন্য বাশের সাকো, সময়ের ব্যবধানে সেই স্থানই এখন মানুষের অবসর কাটানোর নতুন ঠিকানা। ভৈরব নদীর সংযোগস্থল ঘিরে নির্মিত সুবলপুর ওয়াটার রিজার্ভারে প্রতিদিন বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। বিকেল গড়াতেই পরিবার, শিশু-কিশোর ও তরুণদের উপস্থিতিতে বদলে যায় এলাকার চেনা দৃশ্য। তবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা এই দর্শনার্থী কেন্দ্রকে পরিকল্পিতভাবে সাজানো গেলে এটি দামুড়হুদা উপজেলার নতুন বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার সুবলপুর এলাকায় নির্মিত ওয়াটার রিজার্ভারকে ঘিরে গত কয়েক বছর ধরে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের পাশাপাশি দূরবর্তী এলাকা থেকেও মানুষ এখানে আসছেন নদীর পানি, খোলামেলা পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে। ছুটির দিনে দর্শনার্থীর চাপ আরো বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এলাকাটি ছিল মূলত যোগাযোগের একটি পথ। পাটাচোরাসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ একটি বাশের সাকো ব্যবহার করে চলাচল করতেন। পরে সেখানে ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণের পর স্থানটির চিত্র বদলে যায়। এখন এটি শুধু একটি পানি সংরক্ষণ স্থাপনা নয়, ধীরে ধীরে মানুষের অবসর কাটানোর স্থান হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে।
কিন্তু দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলোর অভাব, বসার জায়গার সঙ্কট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। রিজার্ভারের আশপাশের কিছু স্থান ঢালু হওয়ায় অসতর্কতায় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকাটিতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, বসার ব্যবস্থা, নিরাপদ হাটার স্থান, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট পার্কিংয়ের ব্যবস্থা এবং বখাটেদের উৎপাত ও ইভটিজিং প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় দর্শনার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে জায়গাটি মানুষের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য এটি ভালো একটি স্থান। তবে দর্শনার্থী বাড়ার সাথে সাথে বসার জায়গা, আলো, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থাও বাড়ানো দরকার।’
সুবলপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু বকর মাস্টার বলেন, ‘এই অঞ্চলে বিনোদনের জন্য তেমন কোনো জায়গা নেই। ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণের পর মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এখানে আসতে শুরু করেছে। এখন পরিকল্পিত কিছু উদ্যোগ নেয়া গেলে জায়গাটি আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।’
পাটাচোরা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য কুতুবউদ্দিন বলেন, ‘আগে এই জায়গাটি ছিল মানুষের যাতায়াতের পথ। এখন সেই জায়গার পরিচয় বদলে গেছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ এখানে আসছেন। পরিকল্পনা করে উন্নয়ন করা হলে সুবলপুরের এই স্থানটি পুরো উপজেলার মানুষের জন্য একটি পরিচিত বিনোদনকেন্দ্র হতে পারে।’
দর্শনার্থীর আনাগোনা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ইতোমধ্যে এলাকাটিকে কেন্দ্র করে চা, নাশতা ও ছোটখাটো বিভিন্ন ব্যবসা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে এবং স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল করিম বিশ্বাস বলেন, ‘সুবলপুর ওয়াটার রিজার্ভারকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে আসছেন। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য কী কী করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করা হবে।’
এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাবলী ইয়াসমিন বলেন, ‘ওয়াটার রিজার্ভারটি পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্মাণ করেছে। জায়গাটির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য কী করা যায়, সে বিষয়ে তাদের সাথে কথা বলা হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বসার জায়গাসহ দর্শনার্থীদের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা নিয়ে আগামী সভায় আলোচনা করা হবে।’
স্থানীয়দের আশা, শুধু একটি স্থাপনা হিসেবে নয়, মানুষের বিনোদন ও অবকাশযাপনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে সুবলপুর ওয়াটার রিজার্ভার এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হবে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ভৈরবপাড়ের এই বদলে যাওয়া স্থানটি একদিন দামুড়হুদার পরিচিত অবকাশকেন্দ্রের নতুন নাম হয়ে উঠতে পারে।



