বন্দর নগরী চট্টগ্রামে টানা ভারি বৃষ্টির কারণে জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বেলা ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪১২.৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারি বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি একাকার হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ব্যাপক জনভোগান্তির কারণ হয়েছে।
ভারি বৃষ্টিতে সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে পতেঙ্গা এলাকায় আউটার রিং রোডের একাংশ ধসে পড়েছে। বৃষ্টির পাশাপাশি ঝড়ো হাওয়ায় বৈরী পরিবেশের কারণে চট্টগ্রামে অবতরণের কথা থাকলেও আবুধাবি ও সারজাহ থেকে আসা পৃথক দু’টি বিমান ঢাকায় অবতরণ করতে হয়েছে। এছাড়া ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের অপর একটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামতে না পেরে ঢাকায় ফেরত গেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এসব এলাকায় কোথাও কোথাও কোমর সমান পানি জমেছে। সড়কে পানি মাড়িয়ে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নগরীর সড়কগুলোতে যানবাহনের সংখ্যাও কম। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। বিশেষ করে চাকরিজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ ও জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষগুলোকে মারাত্মক দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নগরীর অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করলেও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষা নিয়েছে। ফলে এসব শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এর মধ্যে আবার অফিসমুখী মানুষগুলোকেও চট্টগ্রামের অফিসপাড়া খ্যাত আগ্রাবাদ এলাকার সড়কে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।
চট্টগ্রাম পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার বেলা ৩টা পর্যন্ত) ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ ধরনের ভারি বৃষ্টিপাত আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। মৌসুমী বায়ু সক্রিয় রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে, টানা ভারি বৃষ্টিতে নগরীর বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, ফরিদার পাড়া, চান্দগাঁও, চকবাজার, বহদ্দারহাট, প্রবর্তকমোড়, বাকলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা, কাট্টলীর ঈশান মহাজন সড়ক, হালিশহরের কে ও এল ব্লকের সোনালি আবাসিক, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কের বড়দীঘিরপাড় এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নগরীর আগ্রাবাদ ও কাতালগঞ্জে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি হয়েছে। কাতালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারা সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার দিনভরই পানিবন্দী ছিলেন।
ধসে পড়েছে আউটার রিং রোডের একাংশ
ভারি বর্ষণের কারণে সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় আওটার রিং রোড সড়কের একাংশ ধসে পড়ে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকার ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাশে ওই অংশটি ধসে পড়ে। এই সড়ক ব্যবহার করে বন্দরের ট্রাক ও বিমানবন্দরের যানবাহন চলাচল করে। তাই দ্রুত সড়কটি মেরামত করা না হলে আমদানি রফতানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পরার আশঙ্কা আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈরী আবহাওয়ায় আন্তর্জাতিক ও আভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ঢাকায় অবতরণ
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী ইব্রাহীম খলিল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, বাতাসের তীব্রতা বেশি থাকায় ফ্লাইট অপারেশনে সমস্যা হচ্ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বিএস৩৫০ (আবিধাবি-চট্টগ্রাম) ফ্লাইট ও এয়ার আরাবিয়ার ফ্লাইট জি৯-৫২৬ (শারজাহ-চট্টগ্রাম) ডাইভার্ট হয়ে ঢাকা অবতরণ করেছে। এছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এর ফ্লাইট বিজি১২১ (ঢাকা-চট্টগ্রাম) পুনরায় ঢাকা ফিরে গেছে। বৈরী আবহাওয়াজনিত কারণে এ বিমানবন্দর দিয়ে আজ এরাইভাল এবং ডিপার্চার হওয়া প্রায় সব ফ্লাইট ই স্বাভাবিক এর তুলনায় ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
সমুদ্র বন্দরসমূহে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উড়িষ্যা ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ ঝাড়খন্ড এলাকায় অবস্থানরত মৌসুমি স্থল নিম্নচাপটি উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে বর্তমানে সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে পূর্ব মধ্য প্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরো পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, সুস্পষ্ট লঘুচাপের কেন্দ্রস্থল, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে।
সমুদ্র বন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
বৃষ্টির পূর্বাভাস
এদিকে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে আগামীকাল বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের ভারী বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসাথে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।



