গাজীপুরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব : নতুন মোড়কে সক্রিয় পুরোনো সিন্ডিকেট

স্থানীয় বিএনপির একাংশের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসার দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ বদলালেও আড়ালে আওয়ামী লীগের পুরোনো সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়।

মো: আজিজুল হক, গাজীপুর মহানগর

Location :

Gazipur
গাজীপুরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব : নতুন মোড়কে সক্রিয় পুরোনো সিন্ডিকেট
গাজীপুরে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব : নতুন মোড়কে সক্রিয় পুরোনো সিন্ডিকেট |নয়া দিগন্ত

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ঝুট (কারখানার বর্জ্য) ব্যবসায়কে কেন্দ্র করে একের পর এক সংঘর্ষ, মামলা ও রাজনৈতিক বিরোধ সামনে আসছে। স্থানীয় বিএনপির একাংশের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসার দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ বদলালেও আড়ালে আওয়ামী লীগের পুরোনো সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়।

সম্প্রতি টঙ্গী বিসিকে অস্ত্রের মহড়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলা এবং পশ্চিম থানা তাঁতীদল নেতাকে ঘিরে ঘটনাকে তারা সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গাজীপুর মহানগরজুড়ে কয়েকশ’ কোটি টাকার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। স্থানীয় বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যবসার দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এলেও বাস্তবে আওয়ামী লীগের আগের প্রভাবশালী একটি অংশ এখনো নামে-বেনামে বিভিন্ন শিল্পকারখানার ঝুট ব্যবসায় যুক্ত রয়েছে।

তাদের দাবি, কোথাও কোথাও বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে আবার কোথাও গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ওই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ত্যাগী নেতাকর্মীরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেই সংঘর্ষ, মামলা কিংবা রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।

এই অভিযোগের সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে টঙ্গীর বিসিক শিল্পাঞ্চলে অস্ত্র উঁচিয়ে মোটরসাইকেল শোডাউনের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়টি সামনে এনেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।

শুক্রবার সকালে টঙ্গীর গোপালপুর পূর্বপাড়া মদিনাবাজারে অনুষ্ঠিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে তারা মামলাটিকে ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও পলিটিক্যাল উদ্দেশ্যপ্রোণোদিত’ (রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত) দাবি করেন। একই সাথে ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো: কামাল হোসেন বুলুকে দলীয় পদে পুনর্বহালের দাবিও জানান।

বক্তারা বলেন, কামাল হোসেন বুলু, টঙ্গী পূর্ব থানা যুবদলের সদস্য সচিব নাজমুল হোসেন মণ্ডল, শ্রমিক নেতা কাজী দাউদসহ যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

বিএনপি নেতা আরিফের দাবি, প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে মোটরসাইকেল শোডাউনকে ‘অস্ত্রের মহড়া’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি পুরোনো কিশোর গ্যাংয়ের ভিডিও তাদের সাথে যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে মামলার বাদী ব্যবসায়ী মো: নুরুজ্জামান জামান এজাহারে অভিযোগ করেন, ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেয়ায় শতাধিক মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে অস্ত্রসহ মহড়া দেয়া হয় এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায় গিয়ে ঝুট বিক্রি না করার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হয়।

তবে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, নুরুজ্জামান অতীতে স্থানীয় যুবলীগ নেতা সেলিম ও ইয়াসিনের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ঝুট ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তিনি বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশের ঘনিষ্ঠ হয়ে যুবলীগ নেতাদের পক্ষে একই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাদের দাবি, এ বিরোধ মূলত ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে।

একই ধরনের আরেকটি ঘটনার নজির হিসেবে স্থানীয় নেতারা টঙ্গী পশ্চিম থানা তাঁতীদলের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন খোকনের গ্রেফতারের ঘটনাও তুলে ধরছেন।

তাদের অভিযোগ, প্রতিবেশী একটি হিন্দু পরিবারের সাথে স্থানীয় বিরোধ সামাজিকভাবে মীমাংসা হওয়ার পরও ঘটনাটিকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের রূপ দিয়ে খোকনকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে দল থেকেও বহিষ্কার করা হয়।

বিএনপির একটি অংশের দাবি, এলাকায় জমি দখল ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় পরিকল্পিতভাবে তাকে বিতর্কিত করা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা আরো অভিযোগ করেন, মহানগরজুড়ে ঝুট ব্যবসা বিএনপির মোড়কে এখনো আগের প্রভাবশালী আওয়ামী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তাদের ভাষ্য, দৃশ্যত ব্যবসায়ীদের পরিচয় বদলালেও আওয়ামী লীগ নেতারা বিদেশে পলাতক থেকেও বিভিন্ন চ্যানেলে এখনো লাভের অংশ পাচ্ছেন।

তারা আরো অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না, বরং আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন—বর্তমানে বিএনপির এমন একটি প্রভাবশালী অংশ এখনো পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে গোপন সমঝোতায় ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের এই নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে গিয়েই বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সাথে ‘আওয়ামী-বিএনপি যৌথ সিন্ডিকেট’ এর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

টঙ্গীর সাম্প্রতিক ঘটনার আগে গাছা ও বাসন এলাকায়ও আলোচিত বিরোধে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অতীতেও বিভিন্ন পক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। এ অবস্থায় কোন কোন কারখানায় নামে-বেনামে কারা ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে, ব্যবসায়িক চুক্তি কার সাথে, আর ঝুট আনতে যাচ্ছে কারা—এসব তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা। এক্ষেত্রে তারা ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে ক্ষমতার পালাবদলের পর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।