উজিরপুরে হাম ও ডায়রিয়ার প্রকোপ ২৪ ঘণ্টায় ২২ রোগী ভর্তি

চলতি বছর উপজেলায় হাম ও উপসর্গ নিয়ে হাসাপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪০০ শিশু, তাদের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়। হামের ভয়াবহতা না কাটতেই উপজেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ডায়রিয়া।

বিএম রবিউল ইসলাম, উজিরপুর (বরিশাল)

Location :

Wazirpur
উজিরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
উজিরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স |নয়া দিগন্ত

বরিশালের উজিরপুরে হাম ও ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপজেলায় নতুন করে আরো ২২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত তিন মাসে সাতশোর বেশি মানুষ হাম ও ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

সোমবার (১১ মে) সরেজমিনে ভর্তি রোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে বেড, ওষুধ ও চিকিৎস্যক সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা।

চিকিৎস্যকরা বলছেন, বেডের থেকে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় চিকিৎস্যা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

চলতি বছর উপজেলায় হাম ও উপসর্গ নিয়ে হাসাপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪০০ শিশু, তাদের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়। হামের ভয়াবহতা না কাটতেই উপজেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ডায়রিয়া।

গত তিন মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাম ও ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন সাত শত তিন জন। যার মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি।

রোগীদের চাপ সামলাতে না পেরে শিশু-নারী ও পুরুষদের রাখা হয়েছে একই কক্ষে। বেড ও মেঝেতে বিছানা করে চিকিৎস্যা নিচ্ছেন আক্রান্ত রোগীরা।

ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে শিকারপুর ইউনিয়নের দুই বছরের শিশু আনাবিয়া ভর্তি হয়েছে উপজেলা ৫০ শয্যা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

আনাবিয়ার বাবা নিয়াজ মল্লিক বলেন, ‘রাত থেকে হঠাৎ পাতলা পায়খানা ও বমি শুরু হয়। এরপর খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লে সকালে হাসপাতালে নিয়ে আসলে ভর্তি দেয় চিকিৎস্যক। কিন্তু হাসপাতালে বেড না থাকায় মেঝেতেই চিকিৎস্যা নিতে হচ্ছে। মেঝেতে চিকিৎস্যা নেয়ায় ডায়রিয়ার পাশাপাশি এখন জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে আনাবিয়া।’

হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎস্যা নিচ্ছেন ১৪ জন রোগী। ওয়ার্ডে দেখা যায় আনাবিয়ার মতোই শিশুর সংখ্যা বেশি। এরপর নারী রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে সব থেকে বেশি শিশু ও বৃদ্ধ।

উপজেলার আজিজ মিয়া সবুজ মিয়া তার মেয়ে হাসিকে ভর্তি করেছেন রোববার রাতে। আজিজ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘হাসপাতালের মেঝেতে জায়গা পেয়েছি। পা ফেলার মতো জায়গা নেই। ডায়রিয়ায় শিশুদের জন্য আলাদা কক্ষ না করে নারী ও শিশুসহ সব বয়সি মানুষ একই কক্ষে চিকিৎস্যা নিচ্ছে।’

বড়াকোঠা ইউনিয়নের সাকরাল গ্রামের রফিক হাওলাদার চার বছরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদাউসকে ভর্তি করেছেন হাসাপাতালে। চিকিৎসা নিয়ে জান্নাতুল কিছুটা সুস্থ্য হলেও হাসপাতালে থাকতে থাকতে আক্রান্ত হয়েছে তার বড় মেয়ে মাহিনুর। এখন তারাও ভর্তি হাসাপাতালে। হাসপাতাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না রাখা এবং সব বয়সী রোগীদের এক কক্ষে চিকিৎস্যা দেয়ায় রোগীদের সাথের স্বজনরাও আক্রান্ত হচ্ছে ডায়রিয়ায়।

ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে গত তিন দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎস্যা নিচ্ছেন ৪৫ বছরের বিধান চন্দ্র। তিনি বলেন, ‘হাসাপাতালে শুধু স্যালাইন দিচ্ছে বাকি সব ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাহিরে থেকে। অথচ এই ওষুধ কেনার সামর্থ্য অনেকেরই নেই।’

রোগীদের অভিযোগ, প্রতি ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসক আসেন একবার সকালে ৯টায়। এরপর কেউ ভর্তি হলে তারা ফের চিকিৎসকের দেখা পায় পরের দিন সকাল ৯টায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাসি পচা খাবার খাওয়া অতিরিক্ত গরম ও অনিরাপদ পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া প্রার্দুভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুপেয় পানির অভাবের কারণে এবং স্যালাইন ওয়াটার হয়ে যাওয়ার কারণে ডায়রিয়া এবং ডায়রিয়ার ডিজিস টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েডসহ অন্যান্য রোগের প্রকোপ বাড়ে।’

উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: এস এম মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘৫০ শয্যা হাসপাতালে হাম, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭৫ জন। তাই ছোটোখাটো কিছু অভিযোগ থাকলেও সর্বোচ্চ সেবা দেয়া আমাদের লক্ষ্য।’

ওষুধ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যালাইনের সংকট নেই। ডায়রিয়ায় সব থেকে বেশি প্রয়োজন স্যালাইন আমাদের সেসব আছে। এছাড়া, কিছু ওষুধ আমাদের নেই, সেসব বাইরে থেকে কিনতে হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আবহাওয়া বিবেচনায় প্রতি বছর এই সময়ে এমন পরিস্থিতি হয় উপকূলে।’

তরমুজসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল খাওয়ায় সতর্ক থাকার পাশাপাশি খাবার ও রান্নার পানি বিশুদ্ধকরণের পরামর্শ দেন তিনি। হাসপাতালের সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চিকিৎস্যক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।’