কুড়িগ্রামের উলিপুরে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও স্বস্তির বদলে উৎকণ্ঠাই বাড়ছে কৃষকদের। মাঠজুড়ে কাটামাড়াইয়ের ব্যস্ততা থাকলেও টানা বৃষ্টি আর নিম্নমুখী বাজারদর—এই দুই চাপে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। ভেজা ধান ঘরে তুলেও শুকাতে না পারায় লোকসানের আশঙ্কা আরো ঘনীভূত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটতে যেমন দেরি হচ্ছে, তেমনি কাটা ধানও ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই ভেজা ধান নিয়েই বিপাকে পড়েছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সঙ্কট ও বাড়তি মজুরি—সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণের কাছাকাছি।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে উলিপুরে মোট ২২ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাত ৮ হাজার ৩৯০ হেক্টর, উফশী ১৪ হাজার হেক্টর এবং স্থানীয় জাত ১৪০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৫ মেট্রিক টন। বীজতলা প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি অগ্রগতি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা সময়ের সাথে লড়াই করে ধান কাটছেন। তবে হঠাৎ বৃষ্টি আর শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেতেই পাকা ধান জমিতে পড়ে থাকায় ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
থেতরাই ইউনিয়নের হারুনেফড়া এলাকার কৃষক আশরাফ আলী জানান, প্রায় ৮ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন তিনি। কিন্তু সারের উচ্চমূল্য ও সঙ্কটের কারণে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে।
‘কিছু ধান ঘরে তুলেছি, কিন্তু বেশির ভাগ এখনো মাঠেই পড়ে আছে। আবহাওয়া খারাপ থাকায় কাটাও যাচ্ছে না, শুকানোও যাচ্ছে না। এই দামে ধান বিক্রি করলে খরচই উঠবে না’—বললেন তিনি।
একই সুর শোনা গেছে অন্য কৃষকদের কণ্ঠেও। ফুল মিয়া, আমজাদ আলী, সুশান্ত কুমার, আব্দুল হামিদ ও জাহাঙ্গীর আলমসহ অনেকেই জানান, এই ফসলের ওপরই তাদের সারা বছরের জীবিকা নির্ভরশীল। কিন্তু চাষাবাদের সব খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও বাজারে ধানের দাম আশানুরূপ না হওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এদিকে রাজারহাট আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬১.৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এমন আবহাওয়া আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। পরে ধীরে ধীরে বৃষ্টিপাত কমে তাপমাত্রা বাড়তে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। তবে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা বিবেচনায় দ্রুত পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
বাজারদর উন্নত হলে কৃষকেরা লাভবান হবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সব মিলিয়ে, ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও আবহাওয়া আর বাজার—এই দুই অনিশ্চয়তা উলিপুরের বোরো চাষিদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



