দর্শনায় ভিজিএফ’র চাল বিতরণ নিয়ে দ্বন্দ্ব, তালিকা জটিলতায় বঞ্চিত গরীব-অসহায়রা

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌরসভায় ভিজিএফের চাল বিতরণ কার্যক্রমকে ঘিরে রাজনৈতিক (বিএনপি-জামায়াত) নেতাকর্মীদের মতানৈক্য, তালিকা প্রণয়নে জটিলতা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে।

মনিরুজ্জামান সুমন, দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)

Location :

Damurhuda
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌরসভা
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌরসভা |নয়া দিগন্ত

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌরসভায় ভিজিএফের চাল বিতরণ কার্যক্রমকে ঘিরে রাজনৈতিক (বিএনপি-জামায়াত) নেতাকর্মীদের মতানৈক্য, তালিকা প্রণয়নে জটিলতা ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। তালিকা তৈরিতে রাজনৈতিক বিভেদ ও অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়ায় প্রকৃত দরিদ্র, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও অসহায় অনেক মানুষ চাল না পেয়ে কান্না করতে করতে বাড়ি ফিরে গেছেন। অন্যদিকে কিছু সচ্ছল ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী ভিজিএফের চাল পেয়েছেন এমন অভিযোগ উঠায় এলাকায় সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, দর্শনা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের মোট ৩ হাজার ৮৫ জন উপকারভোগীর জন্য কার্ডপ্রতি ১০ কেজি হারে মোট ৩০ হাজার ৮৫০ কেজি ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার (১১ ও ১২ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত পৌরসভার ৩, ৪, ৫ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভিজিএফের চাল বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। তবে তালিকায় নাম না থাকায় বহু দরিদ্র মানুষ চাল পাননি। আগামী রোববারের (১৫ মার্চ) মধ্যে তালিকার সম্পন্ন করে চাল বিতরণ শেষ করা হবে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।

চাল নিতে এসে তালিকায় নাম না পেয়ে অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও অসহায় নারী চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বাড়ি ফিরে যান। ভুক্তভোগীদের একজন বৃদ্ধা বলেন, ‘আমাদের দুনিয়ায় কেউ নেই স্বামী নেই, সন্তান নেই। কাজ করার শক্তিও নেই। মানুষের দয়ার ওপর বা ভিক্ষা করে বেঁচে থাকি। তারপরও আমরা চাল পেলাম না।’

ইসারন নেছা নামের আরেক বৃদ্ধা বলেন, ‘আমার কেউ নেই। এখন পর্যন্ত আমাকে তেল কেন, চালের কার্ডও দেয়া হয়নি। এ কথা বলতে বলতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।’

নিয়াজ উদ্দিন নামের এক ভ্যানচালক জানান, ‘আমি ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। তবুও কোনো কার্ড পাইনি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, তালিকা প্রণয়নের সময় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যকার মতবিরোধ ও প্রভাব খাটানোর কারণে অনেক প্রকৃত দরিদ্রের নাম বাদ পড়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন ওয়ার্ডে তালিকা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চাল বিতরণ কার্যক্রমে।

চাল বিতরণের সময় অনিয়মের ঘটনাও সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, এক নারী একাই ১৭টি টোকেন বা কার্ড নিয়ে চাল নিতে এলে বিষয়টি দর্শনা পৌরসভার প্রধান সহকারী শাহ আলমের নজরে আসে। পরে তিনি টোকেনগুলো জব্দ করে প্রকৃত মালিকদের কাছে তা হস্তান্তর করেন।

এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে চাকরিজীবি কয়েকজন এবং বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী কয়েকজনও এই ভিজিএফের চাল পেয়েছেন। অথচ প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের নাম তালিকায় না থাকায় তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

জানা গেছে, গত ৩ মার্চ দর্শনা পৌর কর্তৃপক্ষ ভিজিএফের চাল সুষ্ঠুভাবে বিতরণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের (বিএনপি-জামায়াত) নেতাদের নিয়ে একটি সভা করে। সভায় দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করে জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মতভেদ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তালিকা প্রস্তুতের কাজ শেষ হয়নি।

পৌর প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, তালিকা প্রস্তুতের জন্য সর্বোচ্চ ৮দিনের সময় দেয়া হলেও প্রায় ১০দিন পেরিয়ে গেলেও কয়েকটি ওয়ার্ডের তালিকা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

দর্শনা পৌর বিএনপির সমন্বয়ক হাবিবুর রহমান বুলেট বলেন, ‘পৌর কর্তৃপক্ষ যখন আমাদের নেতৃবৃন্দকে ডাকেন, তখন আমরা ৯টি ওয়ার্ডের জন্য দুইজন করে প্রতিনিধি নির্বাচন করে দেই। তাদের মাধ্যমেই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। কিছু ওয়ার্ডের তালিকা জমা পড়েছে, বাকিগুলোও জমা পড়বে। তবে কোনো সচ্ছল ব্যক্তি যদি ভিজিএফের চাল পেয়ে থাকে, তাহলে যারা তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তারা ঠিক করেননি। চাহিদার তুলনায় কার্ডের সংখ্যা খুবই কম।’

অন্যদিকে দর্শনা পৌর জামায়াতের আমির শাইকুল ইসলাম অপু অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার দলের লোকজন এই ধরনের কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নয়। স্বজনপ্রীতি বা আত্মীয়করণ আমাদের দলের কেউ করেনি। যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে অন্য দলের লোকজন করে থাকতে পারে। আমাদের ৯টি ওয়ার্ডে ১৮ জন প্রতিনিধি তালিকা প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন করেছেন এবং প্রাপ্য ব্যক্তিদের নামই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও দর্শনা পৌর প্রশাসক শাহিন আলম বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে অসহায় দুস্থদের তালিকা করা হয়েছে। পূর্বের তালিকা থেকেও কিছু নাম নেয়া হয়েছে। প্রথম দিনে তিনটি ওয়ার্ডে চাল বিতরণ হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘একটি ওয়ার্ডে অনেক অসহায় মানুষ বসবাস করেন। সবাইকে তো কার্ড দেয়া সম্ভব নয়। সরকার যে পরিমাণ কার্ড দিয়েছে, সেই অনুযায়ী তালিকা করা হয়েছে। তবে কোনো স্বচ্ছল ব্যক্তি কার্ড পেয়ে থাকলে বা কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’