সকাল ৭টায় ভাত খেয়ে তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল মেয়েটি। বলেছিলাম, এতো তাড়া কিসের? পাঁচ মিনিট পর বের হও। কিন্তু মেয়ে কথা শুনে নাই। তার অসুস্থ আব্বুকে কলেজে গিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলে তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। কিন্তু মেয়ে কলেজে পৌঁছাতে পারেনি। বাড়ি থেকে বের হওয়ার দুই ঘণ্টা পর আসে মৃত্যুর খবর।
লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়ের লাশের সামনে বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সুমাইয়ার মা ইয়াছমিন আক্তার। মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন তার কলেজ পড়ুয়া বড় মেয়ে সুমাইয়া জান্নাত (২০)। উপজেলার চুনতি বাজার এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কক্সবাজারগামী ইম্পেরিয়াল পরিবহনের একটি বাস ও চট্টগ্রামগামী পূরবী পরিবহনের একটি বাস চুনতি বাজার এলাকায় পৌঁছালে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় বাসের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজন যাত্রী আহত হন।
স্থানীয় লোকজন ও লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গুরুতর আহত অবস্থায় ওই কলেজছাত্রীকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত সুমাইয়া জান্নাত বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের আরব শাহ ঘোনাপাড়া জমিদারবাড়ি এলাকার মাওলানা আরিফুল রহমানের মেয়ে এবং চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী।
তবে তাদের পরিবার কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মালুমঘাট এলাকায় নানার বাড়িতে বসবাস করতো। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সুমাইয়া সবার বড়।
মেয়ের লাশের সামনে আহাজারি করছিলেন মা ইয়াছমিন আক্তার। তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন স্বজনরা। কান্না করতে করতে ইয়াছমিন আক্তার বলেন, মেয়ে কলেজের হোস্টেলে সিট নেয়ার কথা ছিল। নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছিল, আজ অভিভাবক নিয়ে যেতে হবে। সুমাইয়ার আব্বু রাঙ্গুনিয়ার একটি মসজিদে ইমামতি করেন। তিনি সেদিক থেকে কলেজে আসছিলেন। আর সুমাইয়া চকরিয়া থেকে চট্টগ্রাম গিয়ে বাবার সাথে মিলিত হওয়ার কথা ছিল।
মা ইয়াছমিন আক্তারের আক্ষেপ, মেয়েকে বলেছিলাম একটু পরে বের হতে। পাঁচ মিনিট পরে বের হলে হয়তো আমার মেয়েটা বেঁচে যেত।
হাসপাতালেই কথা হয় সুমাইয়ার বাবা আরিফুর রহমানের সাথে। তিনি জানান, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সুমাইয়ার সাথে ফোনে কথা হয়েছিল। তার দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর সংবাদ আমাকে কেউ জানায়নি। আমি রাঙ্গুনিয়া থেকে চট্টগ্রাম শহরে যাচ্ছিলাম।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সুমাইয়ার মোবাইলফোনে ফোন দিয়েছিলাম কতদূর এসেছে জানতে। তার ফোন রিসিভ করে একজন পুরুষ। বললেন, এই মোবাইলের মালিক বেঁচে নেই। মুহূর্তেই আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি অসুস্থ মানুষ। মেয়ে স্বপ্ন দেখত, পড়াশুনা শেষ করে চাকরি নিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু মেয়েটিই এখন নাই। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং দুর্ঘটনাকবলিত বাস দু’টি জব্দ করে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কলেজছাত্রীর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই দুই বাসের চালক পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।



