বেনাপোল (যশোর) সংবাদদাতা
বেনাপোল বাংলাদেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর। চট্টগ্রাম বন্দরের পরেই রয়েছে বেনাপোল বন্দরের অবস্থান। বৃহত্তম স্থলবন্দর হওয়া সত্ত্বেও ভারী পণ্য লোড-আনলোড করার জন্য এখানে পর্যাপ্ত ক্রেন-ফর্কলিফটের ব্যবস্থা নেই।
চাহিদার তুলনায় বন্দরে ইকুইপমেন্ট অর্ধেক থাকায় বন্দরে ভারী পণ্য সময়মতো লোড-আনলোড করা সম্ভব হচ্ছে না। যার কারণে বেনাপোল স্থলবন্দরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকছে আমদানি করা ভারী পণ্য। আমদানি করা পণ্য দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আমদানিকারকরা। এসব কারণে বেনাপোল বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য বন্দর দিয়ে আমদানি করছেন আমদানিকারকরা।
বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে কলকাতার দূরত্ব কম হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানিকারকরা ভারত থেকে কলকারখানার ভারী যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আমদানি করে থাকেন বেনাপোল বন্দর দিয়ে। কিন্তু বেনাপোল বন্দরে ভারী পণ্য লোড-আনলোড করার জন্য চাহিদার তুলনায় প্রয়োজনীয় ক্রেন-ফর্কলিফট না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে আমদানি বাণিজ্য। বড় বড় শিল্প-কলকারখানার ভারী পণ্য ভারত থেকে আমদানি হয়ে বেনাপোল বন্দরে আসার পর ওপেন ইয়ার্ডে (খোলা আকাশের নিচে) আনলোড করতে হয়। কিন্তু বন্দরে পর্যাপ্ত ক্রেন-ফর্কলিফট না থাকায় সেসব পণ্য আনলোড করতে ৩-৪ দিন সময় লাগে।
অন্যদিকে কাস্টমস থেকে ছাড়করণের পর বন্দর থেকে পণ্য খালাসের জন্য সেসব পণ্য লোড করতেও আরো ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগে। এই দীর্ঘসূত্রতায় বেনাপোল বন্দরে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সঠিক সময়ে পণ্য না পাওয়ায় বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানার উৎপাদনসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। এসব নানারূপ ভোগান্তির কারণে আমদানিকারকরা বেনাপোল বন্দর ছেড়ে অন্য বন্দর দিয়ে আমদানি করছেন। আর আমদানি কম হওয়ার কারণে বেনাপোল বন্দর থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ও কম হচ্ছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের প্রায় ৩০ শতাংশই ভারী পণ্য। এসব পণ্য দ্রুত ও নিরাপদে খালাসের জন্য কমপক্ষে ১২টি ক্রেন এবং ২০টি ফর্কলিফট প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘গ্রেট বেঙ্গল এন্টারপ্রাইজ’-এর কাছে রয়েছে মাত্র ৭টি ক্রেন ও ৮টি ফর্কলিফট। এর মধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় অর্ধেক সময় এসব ইকুইপমেন্ট অচল থাকে। ফলে জরুরি পণ্য খালাসের জন্য ব্যবসায়ীদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বেনাপোল বন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শহীদ আলী জানান, অদক্ষ ঠিকাদার পরিবর্তনের জন্য এরই মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বেনাপোল বন্দরে চাহিদার তুলনায় অর্ধেক ইকুইপমেন্টের ব্যবস্থা রয়েছে। আবার এগুলোর অধিকাংশ সময় নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে। প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট না থাকায় আমরা সময়মতো ভারী পণ্য লোড-আনলোড করতে পারছি না। আমাদের শ্রমিকরা রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করলেও সময়মতো পণ্য লোড-আনলোড করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য বেনাপোল বন্দরে পর্যাপ্ত ক্রেন-ফর্কলিফটের ব্যবস্থা করা অতি জরুরি।
বেনাপোল আমদানি-রফতানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া জানান, বেনাপোল বাংলাদেশের বৃহত্তম একটি স্থলবন্দর। সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর হওয়া সত্ত্বেও এখানে পর্যাপ্ত ক্রেন-ফর্কলিফট থাকবে না, এটা মেনে নেয়া যায় না। আমরা বন্দরে পর্যাপ্ত ক্রেন-ফর্কলিফটের ব্যবস্থা করার জন্য কয়েকবার বন্দর পরিচালককে জানিয়েছি। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করছে না। বন্দরে ভারী পণ্য লোড-আনলোডসহ নানা ধরনের সমস্যার কারণে আমদানিকারকরা বেনাপোল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
আগে যেখানে বেনাপোল বন্দরে প্রতিদিন ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ আমদানি পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করত, এখন সেখানে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ পণ্যবাহী ট্রাক আসছে। পূর্বের তুলনায় বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি অনেক কমে গেছে। আর আমদানি কম হওয়ার কারণে সরকারের রাজস্ব আদায়ও কম হচ্ছে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বন্দরবিষয়ক সম্পাদক মো: মেহেরুল্লাহ বলেন, ‘ক্রেন অচল থাকায় পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। চাহিদার তুলনায় অর্ধেক যন্ত্রপাতি দিয়ে কোনোভাবেই স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। এতে আমদানি কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।’
গত এক যুগ ধরে বন্দরে এই সমস্যা বিদ্যমান থাকলেও সমাধানে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে লোকসান এড়াতে অনেক আমদানিকারক বেনাপোল ছেড়ে অন্য বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন। এতে বেনাপোল বন্দরের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ভারত-বাংলা ল্যান্ডপোর্ট চেম্বার অব কমার্সের সাব-কমিটির পরিচালক মতিয়ার রহমানও একই হতাশার কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অব্যবস্থাপনার কারণে বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য অনেকাংশে কমে গেছে। এ বন্দরে মূল সমস্যা এখন পর্যাপ্ত ক্রেন-ফর্কলিফট না থাকা এবং নানামুখী হয়রানি। সময়মতো পণ্য ডেলিভারি করতে না পারায় আমদানিকারকরা এ বন্দর থেকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে। এজন্য বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের উচিত বেনাপোল বন্দরে পর্যাপ্ত ক্রেন-ফর্কলিফটের ব্যবস্থাসহ নানামুখী হয়রানি বন্ধ করা।’
এ বিষয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দ্রুতই নতুন ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে এই সঙ্কট নিরসন করা হবে। বেনাপোল বন্দরে পর্যাপ্ত ক্রেন-ফর্কলিফটের ব্যবস্থা হলে ভারী পণ্য লোড-আনলোডে গতিশীলতা ফিরে আসবে।’



