ফেনীতে খাল পুনঃখনন শেষে ৮ কোটি টাকা ফেরত দিলেন ডিসি

বর্ষা মৌসুমে পানি জমে এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। এতে কৃষি জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতো। খাল খনন করার ফলে এখন অনায়াসে পানি নিষ্কাশন হবে। খাল খননে আমাদের অনেক উপকার হলো। আমরা এখন সঠিক সময়ে ধান, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করতে পারব।

শাহাদাত হোসাইন, ফেনী অফিস

Location :

Feni
খাল পুনঃখননের পরের দৃশ্য
খাল পুনঃখননের পরের দৃশ্য |নয়া দিগন্ত

ফেনীতে সাতটি খালের পুনঃখনন কাজ শেষে উদ্বৃত্ত প্রায় আট কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মনিরা হক।

২০২৫-২৬ অর্থ বছরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় এসব খাল খননে ১২ কোটি ২৭ লাখ পাঁচ হাজার ৪৭৮ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

বরাদ্দকৃত অর্থের প্রায় অর্ধেক অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের জন্য রাখা হলেও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও বর্ষার মৌসুম হওয়ায় চাহিদা মতো শ্রমিক পাওয়া যায়নি। ফলে এস্কেভেটরের মাধ্যমে কাজ করায় বরাদ্দকৃত অর্থ সাশ্রয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনের তদারকিও ছিল কঠোর।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সোনাগাজী উপজেলার ডাংগি খালের সাড়ে আট কিলোমিটারের জন্য পাঁচ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৫ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে খনন করা হয় পাঁচ কিলোমিটার খাল।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্র জানায়, অতিবৃষ্টির কারণে পানি বেড়ে যাওয়ায় পুরো কাজটি করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া এই প্রকল্পে শ্রমিক খরচও হয়েছে খুবই কম। খালের কিছু কাজ আগেই করা ছিল। ফলে এখানে মাত্র ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৬২১ টাকা ব্যয় হয় এবং অব্যয়িত চার কোটি ৯০ লাখ ২০ হাজার ৩২৪ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়।

ফুলগাজী উপজেলার তারালিয়া ও নোয়াপুরের গতিয়া খালের দুই কিলোমিটারের জন্য ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকার মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে ব্যয় হয় ৩৫ লাখ ১২ হাজার ৭৫৪ টাকা। এখানে অব্যয়িত ১৬ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ টাকা ফেরত দেয়া হয়।

পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ভেদা খালের তিন কিলোমিটারের জন্য ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ২.৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন সম্পন্ন করতে ৩১ লাখ ১৯ হাজার ৭৮২ টাকা ব্যয় হয়। এখানে কোনো শ্রমিক খাটানো হয়নি ফলে এখানে অব্যয়িত ৪৬ লাখ নয় হাজার ৬১ টাকা ফেরত দেয়া হয়।

ফেনী সদর উপজেলার মোহাম্মদ আলী খালের ৫.৭২৫ কিলোমিটারের জন্য এক কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৩১ টাকা ও দাউদপুর মধুয়াই খালের ৫.৫ কিলোমিটারের জন্য দুই কোটি ৫৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৫ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে যথাক্রমে ৮৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪৭০ টাকা ও এক কোটি ৫১ লাখ ২৮ হাজার ১৬৫ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প দু’টি শতভাগ সম্পন্ন হয়। এখানে দু’টি প্রকল্পে অব্যয়িত এক কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার ৭০ টাকা ফেরত দেয়া হয়।

দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুরের জয়নারায়ণপুর থেকে বিরলী খালের এক কিলোমিটারের জন্য ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা ও জায়লস্করের সিলোনিয়া বাজার থেকে নেয়াজপুর খাল পর্যন্ত দুই কিলোমিটারের জন্য ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কোনো শ্রমিক ব্যবহার ছাড়াই দু’টি প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়। এখানে দু’টি প্রকল্প থেকে অব্যয়িত ৬১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৭ টাকা ফেরত দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একদিকে বর্ষার মৌসুম, অপরদিকে ধার্যকৃত দামে দিনমজুর না পাওয়ায় তাদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা উদ্বৃত্ত থেকে যায়। দিনমজুরের কাজ এস্কেভেটরের মাধ্যমে করায় বিপুল অঙ্কের টাকা সাশ্রয় হয়।

সিনিয়র সাংবাদিক এ কে এম আবদুর রহিমের মতে সরকারি প্রকল্পের কাজ শেষে উদ্বৃত্ত টাকা কোষাগারে ফেরত যাওয়া, এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। জেলা প্রশাসন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি, এমনকি ঠিকাদারদের জন্য এটি অনুকরণীয় হতে পারে। তবে যেসব প্রকল্পের কাজ অবশিষ্ট রয়েছে, তা পরে শুষ্ক মৌসুমে সম্পন্ন করার দাবি জানান তিনি।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, খুবই সুন্দরভাবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে। পুনঃখননে খালগুলো প্রবাহমান হওয়ায় কৃষক ও জনসাধারণের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে প্রকল্পের কাজ শেষে সরকারি কোষাগারে উদ্বৃত্ত টাকা ফেরত দিয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক যে নজির স্থাপন করেছেন তা সারাদেশের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।

জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা মো: মাহবুব আলম জানান, সাতটি খাল পুনঃখনন শেষে সাত কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সার্বক্ষণিক তদারকি ছাড়াও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকগন নিয়োজিত ছিলেন।

তিনি আরো জানান, সাতটি খালের পাড়ে পাঁচ হাজার ২০৩টি ফলজ, বনজ, ঔষধি ও ঝাউ গাছ লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে ফেনী সদরে দু’টি খালের পাড়ে এক হাজার ৫০০, দাগনভূঞার দু’টি খালের পাড়ে ৬০৩, পরশুরামের ৮০০, ফুলগাজীতে এক হাজার ৩০০ ও সোনাগাজীতে এক হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা লাগানো হয়েছে।

তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এসব চারা পরিচর্যার জন্য প্রতিটি প্রকল্পে নির্ধারিত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া মনিটরিংয়ের জন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট করে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এতে করে খালপাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ছাড়াও এসব গাছ বড় হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

জেলা কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক সামছু উদ্দিন খোকন বলেন, বর্ষা মৌসুমে পানি জমে এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। এতে কৃষি জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতো। খাল খনন করার ফলে এখন অনায়াসে পানি নিষ্কাশন হবে। খাল খননে আমাদের অনেক উপকার হলো। আমরা এখন সঠিক সময়ে ধান, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করতে পারব। আমাদের কৃষকদের মাঝে বছরে কয়েকটি ফসল উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: শাহীদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও সর্বোচ্চ সাশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাজের মান বজায় রেখে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

ফেনীস্থ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আতিক উল্যাহ জানান, খাল পুনঃখননের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং শীত মৌসুমে পানি সরবরাহ সচল থাকবে। এতে করে বোরো, আমন, আউশ আবাদ বৃদ্ধি এমনকি সবজি আবাদের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পরে পদক্ষেপ হিসেবে সমান্তরাল বিভিন্ন সংযোগ খালগুলোকে যদি সচল করা হয় তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসন স্থায়ীভাবে সমাধান হবে। এতে করে কৃষি উৎপাদনে জেলায় নতুন দিগন্তের দ্বার উম্মোচিত হবে বলে তার আশাবাদ।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) মনিরা হক বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার থাকায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়নি। প্রকল্প সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্পের আশপাশের অধিবাসীগণ দীর্ঘমেয়াদী ও বহুমুখী সুফল পাবেন। এছাড়া প্রতিটি খালপাড়ে গাছের চারা রোপণ করায় এলাকার পরিবেশেও দারুন প্রভাব পড়বে। কৃষি উন্নয়নে ও জলাবদ্ধতা নিরসনে এসব প্রকল্প মাইলফলক হয়ে থাকবে।