শৈশব মানেই খোলা মাঠে ছুটে চলা, ধুলো মেখে খেলাধুলা আর বন্ধুদের সাথে প্রাণভরে হাসির উচ্ছ্বাস। কিন্তু পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার ১১৯ নম্বর পশ্চিম গাওখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শৈশব যেন সেই চিরচেনা রূপ হারিয়ে ফেলেছে। এখানে বিদ্যালয়ের ঘণ্টা বাজে, পাঠ চলে, শিশুদের কোলাহলও শোনা যায়; শুধু নেই একটি খেলার মাঠ।
যে মাঠে একসময় শিশুদের দৌড়ঝাঁপে মুখর থাকত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, সেই মাঠ আজ নদীর গর্ভে। নদীভাঙন শুধু মাটি কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে শিশুদের খেলাধুলার অধিকার, তাদের শৈশবের এক টুকরো আনন্দও।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের সামনেই খালের ভাঙন। সামান্য অসতর্ক হলেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা। তাই পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন শিক্ষকদের বড় দায়িত্ব। বিশেষ করে সাঁতার না জানা ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
বিরতির সময় অন্য বিদ্যালয়ের মাঠ যখন শিশুদের হাসি-আনন্দে মুখর, তখন পশ্চিম গাওখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভবনের সামনে ছোট্ট একচিলতে জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প করে। কেউ দূরে তাকিয়ে থাকে, কেউ চুপচাপ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়। খেলতে চাইলেও তাদের সামনে নেই কোনো মাঠ।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিঠু বলে, ‘আমাদেরও খুব খেলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু মাঠ নেই, তাই শুধু দাঁড়িয়ে থাকি। অন্য স্কুলের মতো আমাদেরও যদি একটা মাঠ থাকত!’
আরেক শিক্ষার্থী জানায়, আগে বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো। এখন মাঠ না থাকায় সেই আনন্দও হারিয়ে গেছে।
অভিভাবকদের মতে, বইয়ের শিক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি খেলাধুলাও একটি শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার অপরিহার্য অংশ। কিন্তু মাঠ না থাকায় তাদের সন্তানরা শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সাথে বিদ্যালয়ের সামনে নদী থাকায় প্রতিদিনই তাদের মনে কাজ করে অজানা এক শঙ্কা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির খেলার মাঠ ধীরে ধীরে নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে বিদ্যালয়ের সামনে সামান্য কিছু খোলা জায়গা ছাড়া আর কোনো মাঠ নেই। ফলে সমাবেশ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে বিদ্যালয় ভবনটিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জীব কুমার বলেন, ‘খেলার মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যালয় ভবনটিও এখন নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা দ্রুত স্থায়ী ভাঙনরোধ ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি খেলার মাঠের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
নাজিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: আব্দুল হাকিম বলেন, ‘বিষয়টি জেনেছি। শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। নিরাপদ পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করা এবং মাঠের সঙ্কট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে।’



