রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খননের কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
তিনি জানান, সম্ভাব্য স্থান যাচাইয়ের মাধ্যমে উপযুক্ত সময়েই হ্রদের এ খনন কাজ চলবে বলে জানান তিনি।
বুধবার রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ ও মৎস্যজীবিদের খাদ্য সহায়তা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিন মাস মাছ শিকার বন্ধ রাখা হয়। মাছ শিকার বন্ধকালীন সময়ে কেউ যেন হ্রদে মাছ শিকার না করে সে লক্ষে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কাপ্তাই হ্রদের নাব্যতা ঠিক রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলে মাছের উৎপাদন ও পরিবেশ দুটোই উপকৃত হবে।
রাঙ্গামাটি বিএফডিসির ফিসারী পল্টুনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন-বিএফডিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো: ইমাম উদ্দীন কবীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: দেলোয়ার হোসেন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ -বিজিবি রাঙ্গামাটি সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল আবু মোহাম্মদ সিদ্দিক আলম, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট মহা-পরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো: মোবারক হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোছাইন, কাপ্তাই মৎস্য উন্নয়ন ও বিপনন (বিএফিডিসি) কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো: ফয়েজ আল করিম।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কাপ্তাই হ্রদে এক সময় অনেক মাছ পাএয়া যেত বর্তমানে তেমন মাছ পাওয়া যায় না। হ্রদে মাছের উৎপাদন বাড়াতে হবে।
তিনি জেলেদের উদ্দেশ্যে বলেন, যে মাছের পোনা ছাড়া হবে সে মাছ বড় হতে সময় দিতে হবে।
তিনি জেলেদের অনুরোধ রেখে বলেন, মাছ শিকার বন্ধকালীন সময়ে তিন মাস মাছ ধরা থেকে বিরত থাকবেন। সরকার ইতোমধ্যে কৃষক, ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছেন। কাপ্তাই হ্রদের জেলেরাও কৃষক কার্ডের আওতায় পড়বেন। আপনারা ঋণ সুবিধা পাবেন। কৃষক কার্ডে ১০টি ক্যাটাগরি রয়েছে।
তিনি বলেন, সবার আগে দেশ। দেশপ্রেমকে বুকে ধারণ করতে হবে।
তিনি পর্যটন সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে বলেন, কাপ্তাই লেককে দূষণমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এখানে প্রচুর পর্যটক আসেন। কাপ্তাই হ্রদকে দূষণ থেকে বাঁচাতে পর্যটন সংশ্লিষ্টরাও পর্যটকদের সচেতন করবেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: দেলোয়ার হোসেন কাপ্তাই হ্রদে মাছের অভয়াশ্রমগুলো রক্ষার উপর গুরত্বরোপ করে বলেন, মাছের প্রাকৃতিক প্রজননের জন্য অভয়াশ্রমের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে বিস্তৃত করা প্রয়োজন। দূষণ থেকে রক্ষা করতে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে কোনো প্রকার প্লাষ্টিক বর্জ্য না ফেলতে সকলের প্রতি আহবান জানান তিনি। পরে প্রতিমন্ত্রী কাপ্তাই হ্রদে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন এবং মৎস্য চাষিদের মাঝে ভিজিএফের চাল বিতরণ করেন।
উল্লেখ্য, কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় পোনা অবমুক্তির জন্য বিএফডিসি রাঙ্গামাটির নিজস্ব হ্যাচারিতে রুই, কাতল ও মৃগেল মাছের রেনু উৎপাদন করে থাকে। বিএফডিসির মারিশ্যাচর হ্যাচারিতে রেনু উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ কেজি।
বিএফডিসি হালদা নদী থেকে সংগৃহীত রেনু/পোনা থেকে তৈরী করা ব্রুড মাছ দিয়ে হ্যাচারিতে রেনু উৎপাদন করে থাকে। উৎপাদিত রেনু সারা বছর বিএফডিসির নিজস্ব ১৩টি নার্সারি পুকুরে প্রতিপালন করে প্রতি বছর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কাপ্তাই হ্রদে অবমুক্ত করা থাকে। বিএফডিসি ২০২৫ সালে ৬০.৫৯ টন পোনা মাছ কাপ্তাই হ্রদে অবমুক্ত করে। এছাড়া হ্রদের মাছের আহরণ, পরিবহণ ও বাজারজাতকরণ রোধকল্পে পাহারা ও তদারকি নিশ্চিত করে বিএফডিসি।
কাপ্তই হ্রদের বিলুপ্ত প্রায় মৎস্য প্রজাতি রক্ষা এবং জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য হ্রদ এলাকার বিভিন্ন স্থানে সাতটি অভয়াাশ্রম তৈরি করা হয়েছে। ছয়টি মোবাইল মনিটরিং সেন্টারের মাধ্যমে মৎস্য অভয়াশ্রমসমূহ তদারকিসহ সার্বিক হ্রদ মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করার প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে।
হ্রদে মৎস্য আহরণ বন্ধকালীন মৎস্যজীবিদের জীবিকা নির্বাহের জন্য বিশেষ ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা প্রদান করে থাকে। ২০২৫ সালে ২৬ হাজার ৭৫১ জন দুঃস্থ মৎস্যজীবিকে ১৬০৫.০৬ টন খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এতে দুঃস্থ মৎস্যজীবীরা মৎস্য আহরণ বন্ধকালীন সময়ে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ থেকে বিরত থাকছে যা হ্রদের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বিএফডিসি প্রতি মৎস্যজীবীকে ৩০ কেজি ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় দাফতরিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করণ এবং জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের নির্বাহী আদেশে প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে হ্রদে তিন থেকে চার মাস মৎস্য আহরণ বন্ধ রাখা হয়।
এতে হ্রদে সকল প্রজাতির মাছের বংশ বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। এ সময়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিজিবি, সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, নৌ-পুলিশ, পুলিশ ও আনসারসহ বিএফডিসি'র কর্মকর্তা/কর্মচারীরা। মাছের সুষ্ঠু প্রজননের লক্ষ্যে হ্রদের মাছ কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের অভন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়সমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎ। আয়তন প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর, যা অভ্যন্তরীণ মোট জলাশয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। কাপ্তাই হ্রদটি ১৯৬১ সালে জল বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে তৈরী হলেও মৎস্য সেক্টরের মাধ্যমে দেশীয় ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে। জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করাসহ দেশের সামগ্রিক মৎস্য সেক্টরে কাপ্তাই হ্রদটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির শুরু থেকেই মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের উপর অর্পিত।
কাপ্তাই হ্রদের মোট মাছের প্রজাতি ৮৬টি। এর মধ্যে দেশী প্রজাতি ৭১টি, বহিরাগত মাছের প্রজাতি সাতটি, চিংড়ি প্রজাতি আটটি এবং বাণিজ্যিকভাবে আহড়িত প্রজাতি ৩৬টি।



