যশোরের চৌগাছায় এসিল্যান্ড জি এম এ মুনীব প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি ভূমি অফিসকে ঘুষ-দুর্নীতি ও দালালমুক্ত ঘোষণা করেছেন।
উপজেলা ভূমি অফিসকে ঘুষ, দুর্নীতি ও দালালমুক্ত রাখতে নানা প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জি এম এ মুনীব। তার উদ্যোগে ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের হয়রানি কমেছে বলে সেবা নিতে আসা নাগরিকরা জানিয়েছেন।
উপজেলা ভূমি অফিসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানানো হয়েছে ‘এ ভূমি অফিসে কোনো কাজে ঘুষ লাগে না’—এমন বার্তা সংবলিত সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড। একই সাথে জমির নামজারি ও অন্যান্য ভূমি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে কাজ না করিয়ে সরাসরি অফিসে যোগাযোগ এবং সরকারি ফির অতিরিক্ত কোনো অর্থ কাউকে না দেয়ার জন্য জনগণকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, জমির নামজারির ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফি হিসেবে কোর্ট ফি ২০ টাকা, নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা, রেকর্ড সংশোধন ফি ১ হাজার টাকা এবং মিউটেশন খতিয়ান ফি ১০০ টাকা—সব মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১৭০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। সরকারি ফির বাইরে কেউ অতিরিক্ত অর্থ দাবি করলে কিংবা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ থাকলে সরাসরি এসিল্যান্ডের সাথে যোগাযোগের আহ্বান জানান তিনি।
এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ চত্বর, উপজেলা ভূমি অফিস এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সামনে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভূমি সেবার বিভিন্ন খাতের সরকারি ফি ও অভিযোগ জানানোর মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।
চৌগাছা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রেজাউল করিম ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে বলেন, ‘চৌগাছা ভূমি অফিসে অতিরিক্ত কোনো টাকা-পয়সা দিতে হচ্ছে না। সরকারি খরচ যা, তাই দিচ্ছি। এসিল্যান্ড জি এম এ মুনীব সবসময় সেবা নিতে আসা মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে থাকেন। হয়রানি ছাড়াই আমার কাজ করে দিয়েছেন।’
ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আমির হামজা বলেন, ‘মানুষ এখন আমাদের কাছে এসে আগের মতো হয়রানির শিকার হচ্ছেন না। আমরা সাধ্যমতো দ্রুত ও নিয়ম মেনে সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।’
বুধবার (১৯ আগস্ট) সরেজমিনে ভূমি অফিসে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে কোনো কাজ পেন্ডিং নেই। দায়িত্ব গ্রহণের পর পূর্বের জমে থাকা কাজগুলো নিষ্পত্তির পাশাপাশি নতুন আবেদনগুলোও নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। ভূমি অফিসের রাজস্ব আদায়েও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ ৭৬ হাজার ৪৫১ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৯ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬ লাখ ৮৮ হাজার ১৯৮ টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ লাখ ৭১ হাজার ৪৩৫ টাকা।
চৌগাছায় যোগদানের আগে তিনি বরিশাল জেলার বানারীপাড়ায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানেও নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি সুনাম অর্জন করেন। কিছুদিন আগে ঝিকরগাছা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালেও তাঁর কর্মদক্ষতা ও জনবান্ধব আচরণের প্রশংসা করেন সংশ্লিষ্টরা।
চৌগাছা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার রুহুল আমিন বলেন, ‘চৌগাছা ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে দালালনির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি সরকারি দফতর থেকে সেবা নেয়ার প্রবণতাও বাড়বে।’
তিনি আরো বলেন, সরকারি সেবায় ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান, নির্ধারিত ফির তালিকা প্রকাশ, অভিযোগ জানানোর সরাসরি ব্যবস্থা, পুরোনো পেন্ডিং কাজ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ, ভূমি অফিসের সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের সাথে প্রশাসনের আস্থার সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করবে।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জি এম এ মুনীব বলেন, ‘ঘুষ প্রদানকারী এবং ঘুষ গ্রহণকারী দুজনই সমান অপরাধী। সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার না হন এবং ভূমি সেবা পান, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভূমি অফিসকে ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভূমি সংক্রান্ত সেবা ও অভিযোগের বিষয়ে মানুষ তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন স্থানে মোবাইল নম্বর দেয়া হয়েছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ, সরকারি জমি দখলমুক্ত করা, খাদ্যে ভেজাল, মাদক, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’



