কাকডাকা ভোরে হাতে কোদাল, কাস্তে কিংবা ঝুড়ি নিয়ে একে একে জড়ো হন শত শত মানুষ। কারো চোখে কাজ পাওয়ার প্রত্যাশা, কারো ভাবনায় দিনের মজুরি দিয়ে সংসারের চাকা সচল রাখার হিসাব। ফরিদপুরের বোয়ালমারী রেলওয়ে স্টেশন ও হেলিপ্যাড এলাকায় প্রতিদিন বসা এই শ্রমজীবী মানুষের সমাবেশ স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘শ্রমিক হাট’ নামে। প্রায় এক দশক ধরে চলে আসা এ হাটে কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছেন মৌসুমি কৃষিশ্রমিকরা।
স্থানীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে বোয়ালমারীতে শ্রমিকের চাহিদা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে পাট ও ধানের মৌসুমে জমি প্রস্তুত, আগাছা পরিষ্কার, রোপণ, ফসল কাটা, আঁটি বাঁধা ও পাট জাগ দেওয়ার মতো কাজে বাড়তি শ্রমিক প্রয়োজন হয়। স্থানীয়ভাবে কৃষিশ্রমিকের সঙ্কট তৈরি হওয়ায় সেই চাহিদা পূরণে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাশাপাশি মাগুরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমজীবী মানুষ ছুটে আসেন বোয়ালমারীতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোরে শ্রমিক হাটে কাজের অপেক্ষায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন শ্রমিকরা। কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী দরদাম ঠিক হলে তারা দলবেঁধে চলে যান বিভিন্ন গ্রামের মাঠে। কাজের ধরন ও পরিমাণভেদে বর্তমানে একজন শ্রমিক দিনে ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। সেই সাথে গৃহস্থের বাড়িতে দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। ফলে কয়েক মাসের কৃষি মৌসুমকে কেন্দ্র করে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ঘুরে কাজ করে সংসার চালান এসব শ্রমিক।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, একসময় বোয়ালমারীর গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি, বিদেশগমনসহ নানা কারণে স্থানীয় মানুষের একটি বড় অংশ কৃষিশ্রম থেকে সরে গেছেন। ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও মাঠে কাজ করার মতো স্থানীয় শ্রমিকের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতা পূরণ করছে বাইরের জেলা থেকে আসা মৌসুমি শ্রমিকরা।
বোয়ালমারী রেলওয়ে স্টেশনে থাকা রাজশাহীর দিনমজুর রফিকুল ইসলাম জানান, কাজের সন্ধানে তারা বোয়ালমারীতে এসেছেন। কাজের ধরন অনুযায়ী তারা প্রতিদিন ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। কৃষিকাজের মৌসুমে এখানে কাজের চাহিদা থাকায় দূরবর্তী এলাকা থেকেও শ্রমিকরা আসেন।
রাজশাহীর আরেক দিনমজুর শাহিন হোসেন বলেন, রাজশাহীতে ধান লাগানোর কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা বোয়ালমারীতে এসেছেন। এখানে কখনো সন্ধ্যায়, আবার কখনো ভোরে শ্রমিক হিসেবে বিক্রি হন তারা। কাজের জন্য এসে কেউ কেউ স্টেশনের আশপাশে বাসা ভাড়া করে থাকেন। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
নওগাঁ থেকে আসা দিনমজুর রবিউল শেখ বলেন, আগের তুলনায় কাজের পরিমাণ কমেছে, অথচ দিনমজুরের সংখ্যা বেড়েছে। গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করলে দুই বেলা খাবার দেয়া হয় এবং বিকেলে কাজ শেষে মজুরি পরিশোধ করা হয়।
শ্রমিক নিতে আসা স্থানীয় কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ধান লাগানোর জন্য শ্রমিক নিতে তিনি শ্রমিক হাটে এসেছেন। এলাকার অনেক মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যায় না। ফলে বাইরের জেলা থেকে শ্রমিক এনে কৃষিকাজ করাতে হচ্ছে।



