প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা যাচাই-বাছাই করতে হবে : বাপা সভাপতি ড. নজরুল

চায়না তিস্তা নিয়ে যে প্রকল্পটার উদ্যোগ নিতে চায়, আমরা সেটা যাচাই-বাছাই করে দেখতে চাই। আমাদের এ ব্যাপারে অনেক প্রশ্ন আছে। এসব প্রশ্নের উত্তরে যদি আমরা সন্তুষ্ট হই, তাহলে অবশ্যই এটা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাবো।

সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর ব্যুরো

Location :

Rangpur
সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ড. নজরুল ইসলাম
সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ড. নজরুল ইসলাম |নয়া দিগন্ত

তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রকল্প নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদসহ আন্দোলনে যুক্তরা। বাপার সহ-সভাপতি ড. নজরুল ইসলামের দাবি, ‘প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা অববাহিকার মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারবে কি-না, তা যাচাই-বাছাই সাপেক্ষেই প্রকল্পের দিকে এগোতে হবে। তা না হলে সঙ্কটে পড়বে তিস্তা।’ অন্যদিকে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানীর দাবি, ‘যাচাই-বাছাই ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে ফাইনাল ঋণ প্রস্তাবনার পর বাপার এই দাবি অযৌক্তিক এবং প্রকল্পের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।’

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুর চেম্বার মিলনায়তনে ‘সঙ্কটে তিস্তা নদী, আর্থসামাজিক অভিঘাত’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বাপার সহ-সভাপতি ড. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

এ সময় তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে পাওয়ার চায়না কোম্পানির প্রণীত তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি সামনে আসে। তারপর থেকেই এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলেই তিস্তা সমস্যার সমাধান হবে, এ ধরনের একটা ধারণা সৃষ্টি হয়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা দিয়ে তারা কি করতে চায়? সেটা তিস্তাপারের বাসিন্দাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারবে কি-না? এ বিষয়টার ওপর যাচাই-বাছাইয়ের ওপর আমরা গুরত্বারোপ করছি। কারণ আমাদের দেশের মানুষের একটা কথা আছে। মেঘ দেখলে ভয় পায়, মেঘ দেখলে ভয় পায়।’

এ বিষয়ে ড. নজরুল উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশে ৫০ এর দশকে বিদেশী বিশেষজ্ঞরা উপকূলে আমাদের ওপর বেশকিছু প্রকল্প চাপিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে একটি এলাকায় চতুর্দিকে বাঁধ দিয়ে নদীর পানি আর ওই এলাকায় যেতে দেয়া হয়নি। ফলে যেটা হয়েছে। নদীর পানি না যাওয়ার কারণে সেখানে কোনো পলিমাটি পৌঁছাতে পারে নাই। ফলে সেখানে ভূমির গঠন বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের জন্য এটা আরো বিপজ্জনক হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের সীমা উঠে যাচ্ছে। কাজেই এটা একটা উদাহরণ যে বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এসেই আমাদের জন্য ভালো বললে, সেটা ভালো নয়।’

ড. নজরুল দাবি করেন, ‘চায়না তিস্তা নিয়ে যে প্রকল্পটার উদ্যোগ নিতে চায়, আমরা সেটা যাচাই-বাছাই করে দেখতে চাই। আমাদের এ ব্যাপারে অনেক প্রশ্ন আছে। এসব প্রশ্নের উত্তরে যদি আমরা সন্তুষ্ট হই, তাহলে অবশ্যই এটা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাবো। তিস্তার ব্যাপারে নদীপাড়ের অধিবাসীরা ছাড়া ভালো কেউ কিছু জানেন না। ফলে এটা যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টার গুরুত্ব যে বেশি তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। সরকার বহু বছর এ প্রকল্প সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করার পদক্ষেপ নেয়নি। সম্প্রতি কিছু তথ্য আমরা জানতে পেরেছি। তাদের যে ফিসিবিলিটি স্টাডি, সেটা ২০২৩ সালের সংশোধিত হয়েছে। এর আগে, ২০১৮ সালে একবার হয়েছিল। আমরা এখন সেটা হাতে পেয়েছি। সেটা আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছি। এবং অনেকগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করেছি। আমাদের প্রশ্নগুলো যে যথার্থ তার প্রমাণ হলো যে তারা এ প্রকল্পটা পূনঃনিরীক্ষণ করছে।’

ড. নজরুলের দাবি, ‘আমরা যেহেতু এটা (তিস্তা প্রকল্প) বিনামূল্যে পাচ্ছি না। আর বিনামূল্যে পেলেও প্রকল্পটি যদি ভালোর বদলে মন্দ হয়ে যায়। তাহলে সেটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ১২ হাজার কোটি টাকার মতো একটা ঋণ নেয়া হচ্ছে এবং বাণিজ্যিকভিত্তিক ঋণ নিয়ে কথা হচ্ছে। সেজন্য প্রকল্পটা আরো ঘনিষ্ঠভাবে দেখা প্রয়োজন। সে কারণে বাপা ও বেন থেকে বলা হচ্ছে, সঙ্কটে তিস্তা নদী সমাধান কোন পথে, এ নিয়ে আমরা একটা বই বের করেছি। যাতে সবাই জানতে পারে এ প্রকল্পের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা কি। যেসব জায়গায় দুর্বলতা আছে, সেখানে সমাধানের কি চিন্তা করা যায় এবং এসব বিষয় সমাধান করে সত্যিকার অর্থে তিস্তার যেন সমাধান হয় সেটা আমরা চাই।’

বাপার রংপুর জেলা আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের বৈশ্বিক সমন্বয়ক ড. খালেকুজ্জামান, বাপার কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির, যুগ্ম সম্পাদক ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, শীতলক্ষা বাঁচাও আন্দোলনের সমন্বয়ক হাফিজুল ইসলাম, রংপুর চেম্বার প্রেসিডেন্ট এমদাদুল হোসেন, রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন আরপিইউজের সাধারণ সম্পাদক সরকার মাজহারুল মান্নান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সাবেক রংপুর মহানগর আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি, সিটি প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির মানিক, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের রংপুর সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আফজাল, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি রংপুর জেলার সভাপতি বেলাল হেসেন, গ্রিন ভয়েস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আব্দুল্লা বিন জাহিদ ও কারমাইকেল কলেজ সভাপতি শারমিন জাহান প্রমুখ।

আলোচনায় রংপুর অঞ্চলের দুই কোটি মানুষের জীবনরেখা বাঁচাতে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও পরিবেশকর্মীরা বিজ্ঞানসম্মতভাবে তিস্তা খনন ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানান।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বঞ্ছনার অবসানে বাপা ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) বক্তব্য নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে নদী আন্দোলনে যুক্ত নেতাদের মাঝে। বাপার সহ-সভাপতি ড. নজরুল ইসলামের এ বক্তব্যকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দাবি করেছেন তারা।

তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী জানান, উত্তরের দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার দীর্ঘ লড়াইয়ের পর জুলাই-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তবর্তীকালীন সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। গত বছরের মার্চ মাসে তিস্তারপারের পাঁচ জেলায় গণশুনানি করা হয়। যেখানে পানিসম্পদ বিভাগ, চায়না কোম্পানি ছাড়াও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ, রিভারাইনস পিপলস, তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা ছাড়াও স্থানীয় সব রাজনীতিবিদ, ভুক্তভোগী বাসিন্দা, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমসহ সবাই অংশ নেন।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতেই আরডি ও প্লানিং কমিশন চূড়ান্ত করে চীনের কাছে ফাইনাল ঋণ প্রস্তাব দিয়েছে। গত বছরই পানিসম্পদ উপদেষ্টা ঘোষণাও দিয়েছিলেন যে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এখন যারা আবার যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলছেন, তারা প্রকল্প যেন না হয় সেজন্য ষড়যন্ত্র করছেন। এর মাধ্যমে তারা তিস্তাপারের মানুষের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।’

এমন পরিস্থিতিতে রোববার দুইদিনের রংপুর সফরে আসছেন চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ও পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। নদী পরিদর্শন ছাড়াও চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বৈঠকে বসার কথা রয়েছে।

রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম জানান, চায়না রাষ্ট্রদূত রোববার সন্ধ্যায় রংপুর আসবেন। স্থানীয় একটি তিন তারকা হোটেলে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সাথে বৈঠক করবেন। রাতে রংপুর সার্কিট হাউজে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সাথে ডিনারের অংশ নেবেন। পরেরদিন সকাল সাড়ে ৯টায় তিস্তা নদী ও অববাহিকার গ্রামগুলো পরিদর্শন করবেন। দুপুরে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে মতবিনিময় সভা শেষে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবেন।

১০ বছর মেয়াদি তিস্তা প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয়ের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ধাপে নয় হাজার ১১৫ কোটির মধ্যে দুই হাজার ৪১৫ কোটি টাকা নিজস্ব অর্থায়নে করার কথা জানিয়েছিল বর্তমান সরকার। বাকি ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণের জন্য চীন সরকারের কাছে গত বছর প্রস্তাবনা দিলেও তার কোনো অগ্রগতি নেই। শুধু তাই নয় সমীক্ষাটুকুও হয়নি প্রকল্পটির।