নাম তার মোজাম্মেল হক। তিনি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও তাকে দিনের বেলায় কোনো কার্যদিবসে কার্যালয়ে পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অনুপস্থিত থাকলেও, রাতের আঁধারে অফিস খুলে কিছু সময় বসে হাজিরা খাতা সই করাসহ বিভিন্ন দাফতরিক কাজ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন দফতরের লোকজনের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, মোজাম্মেল হককে তারা কোনোদিনও অফিস করতে দেখেননি। তার অবস্থানও নিশ্চিত করে কেউ জানেন না। কোনো কোনো দিন হঠাৎ সুবিধামতো সময়ে অফিস খুলে আবার বন্ধ করে তিনি চলে যান।
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের ঠিক সম্মুখে দীর্ঘদিন যাবৎ দিনের বেলায় মহিলা বিষয়ক অধিদফতর নিয়ন্ত্রিত এই উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়টি তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকে।
আজ রোববার (৫ জুলাই) এই কার্যালয়টি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামালগঞ্জে কোনো স্থায়ী মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাও নেই। নেমপ্লেটে মো: আফজাল হোসেন নামে একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম লেখা থাকলেও তার উপস্থিতি আশপাশের বিভিন্ন দফতরের কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।
তিনি এই অফিসে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া আসেন না। তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বলে মোবাইল ফোনে জানিয়ে লাইন কেটে দেন। পরবর্তীতে আবার ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, ‘অফিসে সহকারী আছে, অফিস তো খোলা থাকার কথা।’
তবে, মো: মোজাম্মেল হক নামে জনৈক অফিস সহকারী দায়িত্বে থাকলেও তাকে দিনের বেলা কোনো কার্যদিবসে উক্ত কার্যালয়ে পাচ্ছেন না সেবাগ্রহীতারা। এ বিষয়টি ওই কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনিও তাকে (মোজাম্মেল হক) একাধিকবার ফোন দিয়েও পাচ্ছেন না বলে জানান।
অভিযোগ রয়েছে, মোজাম্মেল হক দীর্ঘদিন ধরে দিনের বেলা অনুপস্থিত থাকলেও রাতের আঁধারে অফিস খুলে কিছু সময় বসে হাজিরাসহ বিভিন্ন কাজ গুছিয়ে নেন। সম্প্রতি মোজাম্মেল হককে রাতে লুঙ্গি পরে অফিসে এসে, কিছু সময় বসে একটি টাকার বান্ডিল গুনতে দেখা যায় বাহির থেকে। পরে তিনি ওই টাকা লুঙ্গির ভাঁজে গুঁজে কার্যালয় বন্ধ করে একটি বিকাশের দোকানে গিয়ে লেনদেন করেন।
মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন দফতরের লোকজনের কাছে জানতে চাইলে অনেকেই বলেন, মোজাম্মেল হক ও কর্মকর্তাকে তারা কোনোদিনও অফিস করতে দেখেননি। তাদের অবস্থানও নিশ্চিত করে কেউ জানেন না। বিগত কয়েক মাস যাবৎ মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে এমন তালাবদ্ধ অবস্থাই পাওয়া যাচ্ছে। দরজার পাশে বাইরের দেওয়ালে এক টুকরো কাগজে প্রিন্ট করা অফিস সহকারী মো: মোজাম্মেল হকের নাম ও মোবাইল নম্বর (01733-167598) দেয়া আছে। কিন্তু তিনি কোথায় থাকেন, কী কাজ করেন, তাও কেউ জানেন না।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, দিনের বেলা অফিস সময়ে মহিলা বিষয়ক বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে লোকজন এসে ঘুরে ফিরে গেলেও, অফিস সহকারী মোজাম্মেল হক তার সুবিধামতো রাতের বেলায় অফিসের দরজা খুলে কিছুক্ষণ কাজ সেরে কেটে পড়েন।
সেবা নিতে আসা সদর ইউনিয়নের নয়াহালট গ্রামের আরিফ মিয়া, জামালগঞ্জ নতুন পাড়ার জয়নব খাতুন, বেহেলী ইউপি সদস্য হাফছা আক্তারসহ আরো কয়েকজনকে ওই কার্যালয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
তারা অভিযোগ করে বলেন, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের জরুরি কাজে মো: মোজাম্মেল হক নামক অফিস সহকারী ও কর্মকর্তা আফজাল হোসেনের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য দুই মাস যাবৎ তারা আসা-যাওয়া করছেন, কিন্তু কাউকেই পাচ্ছেন না। এভাবে অনেক নারী মাসের পর মাস এই কার্যালয়ে বারবার এসে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা না পাচ্ছেন কর্মকর্তাকে, না পাচ্ছেন ওই অফিস সহকারীকে।
অভিযোগ উঠেছে, মাসের পর মাস অসংখ্য বার অফিস সহকারী মোজাম্মেল হকের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন ভুক্তভোগী নারীরা। তাকে ফোন করলেও তিনি ফোনকল রিসিভ করেন না। কদাচিৎ ফোন রিসিভ করলেও কোনো কথা না বলেই কিছুক্ষণ পর লাইন কেটে দিয়ে ফোন বন্ধ করে দেন।
মহিলা অধিদফতর সংশ্লিষ্ট উপকারভোগী জনসাধারণ এভাবে হয়রানির শিকার হয়ে চরম বিরক্তি প্রকাশ করছেন।
এ ব্যাপারে বিগত সময়ে উপজেলা নির্বাহী (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তার কাছে স্থানীয় সাংবাদিকরা বিষয়টি অবগত করলেও কোনো সুফল আসেনি।
এ বিষয়ে অফিস সহকারী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আমাকে আপনারা বদলি করে দেন, আমি এখান থেকে চলে যাই। দফতরের কাজে বাইরে থাকতে হয়।’ কিন্তু ফোন রিসিভ করে কথা না বলা কিংবা রাতের বেলায় অফিস কক্ষে কিসের টাকা গুনছিলেন এবং রাতে বিকাশে কার কাছে কত টাকা পাঠিয়েছেন—এসব প্রশ্নের জবাবে তিনি বারবার এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ জে এম রেজাউল আলম বিন আনছারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘জামালগঞ্জ মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আফজাল হোসেন ও অফিস সহকারী মোজাম্মেল—দুজনেরই বিরুদ্ধে স্থানীয়রা আমাকে বারবার ফোন করে জানান। ওদের অ্যাক্টিভিটি ভালো না, খুবই খারাপ। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে কেবল আমাদের প্রধান কার্যালয় ও মন্ত্রণালয়। সেজন্য লিখিত অভিযোগ না পেলে তো আমরা কিছু করতে পারি না। চেয়ারম্যান, মেম্বার সবাই মৌখিক অভিযোগ করেন, লিখিতভাবে কেউ অভিযোগ করেন না। আপনারা যদি কেউ লিখিত অভিযোগ দেন, তবে আমি মন্ত্রণালয়ে লিখব। তখন যদি কিছু একটা হয়।’
এ ব্যাপারে নবাগত জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রাণী মোদক বলেন, ‘বিষয়টি জেনে সাথে সাথেই ওই কার্যালয়ে আমার দফতরের কর্মচারী পাঠিয়েছিলাম। কার্যালয় বন্ধ পাওয়ায় ওই কর্মকর্তাকে কল দিলে তিনি আমাকে জানিয়েছেন চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আছেন। এসে আমার সাথে দেখা হলেই বিস্তারিত জানব এবং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখব।’



