টাঙ্গাইলের নাগরপুরে সলিমাবাদ ইউনিয়নের অন্তর্গত যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে সলিমাবাদ পশ্চিমপাড়া এলাকার অস্তিত্ব প্রায় হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। নদীর এমন ক্রমাগত ভাঙনে চরম দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে পশ্চিমপাড়ার এলাকাবাসী।
যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন। মাত্র কয়েক দিনেই পশ্চিমপাড়া বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় অর্ধশত বাড়িঘর, কুয়েতি মসজিদ, ফসলি জমি ও বহু গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে রয়েছে পাকা রাস্তা, স্কুল, মাদরাসা ও হাটবাজার।
সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যমুনার প্রবল স্রোতে চোখের পলকেই ধসে পড়ছে নদীর তীর। ঘরবাড়ি ও শেষ সম্বলটুকু বাঁচানোর জন্য নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা তাদের ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিচ্ছে। বাস্তুভিটা হারিয়ে অসহায় পরিবারের কেউ কেউ নিকট-আত্মীয়ের বাড়িতে, আবার অনেকেই খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।
ভাঙন-আতঙ্কে রয়েছে নদীর পাড়ের সহস্রাধিক পরিবার। গত কয়েক দিনের টানা ভাঙনে সলিমাবাদ পশ্চিমপাড়া বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি, ভিটামাটি এবং শত শত বিঘা ফসলি জমি ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রাক্ষুসে যমুনার গর্ভে তলিয়ে গেছে কুয়েতের অর্থায়নে নির্মিত ২২ বছরের পুরোনো মসজিদ।
ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এই এলাকায় ভাঙন দেখা দেয় কিন্তু ভাঙন রোধে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। ফলে বারবার তাদের ঘরবাড়ি সরাতে হয়। ভিটেমাটি হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। নদীগর্ভে শেষ সম্বল বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন অনেকে।
এবারের বন্যায় প্রায় শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। যদি এই কষ্ট ও দুর্দশা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপলব্ধি করতেন, তাহলে তারা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। তারা নদী ভাঙনের কষ্টের বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করেন। আরো কত ঘরবাড়ি এবার নদীগর্ভে বিলীন হবে তা অনুমান করা যাচ্ছে না।
এছাড়াও প্রতিবছর বন্যার মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বালুর বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলার মতো সান্ত্বনামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এতে স্থায়ী ভাঙন বন্ধ করা সম্ভব নয়। এখানে এক স্থানে ভাঙন বন্ধ হলে আরেক স্থানে ভাঙন শুরু হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বস্তায় উপকার হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে শুধু টাকাই নষ্ট। ভাঙন যা হওয়ার তাই চলমান থাকে। দুই পাড় উজাড় করে যমুনা নদী ক্রমাগত প্রস্থে বেড়েই চলছে।
আব্দুল হক (৫০) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মাত্র ১৩ শতাংশ নিয়ে তার বসতবাড়ি ছিল। গোটা বসতবাড়ি এখন নদীর পেটে। বসতবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। সহায়-সম্বল হারিয়ে তিনি এখন দিশেহারা।
সুফিয়ান (৫২) নামের আরেক ব্যক্তি জানান, তার একটিমাত্র ছাপরা ঘর ছিল। গাছপালাসহ বসতঘরটি সর্বগ্রাসী যমুনায় গিলে খেয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শাহ জামাল জানান, এক ঘণ্টার মধ্যে ১০ বিঘা জমিসহ বসতভিটা নদীতে তলিয়ে গেছে। কিছুই রক্ষা করতে পারিনি।
সলিমাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের (প্যানেল) চেয়ারম্যান মো: মনির হোসেন ভূঁইয়া জানান, যমুনা নদীর তীরে প্রচণ্ড ভাঙন শুরু হয়েছে। প্রতি বছর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদীভাঙন শুরু হয়। গত কয়েক দিনের মধ্যেই ৩৫টি পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এখনই জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ না হলে মানচিত্র থেকে মুছে যাবে পশ্চিম সলিমাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকা।
নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো: এরফান উদ্দিন জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করা হচ্ছে। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। তাছাড়া সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী ভাঙন প্রতিরোধে ৫টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে কাজ করা হবে।
উল্লেখ্য, ব-দ্বীপ খ্যাত এই নাগরপুর উপজেলায় একপাশে যমুনা নদী এবং অন্যপাশে ধলেশ্বরী নদী বিদ্যমান। প্রতিবারের ন্যায় এবারও যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে সলিমাবাদ ইউনিয়নের চর সলিমাবাদ, পাইকশা, মাইঝাইল, ধুবড়িয়া ইউনিয়নের বলরামপুর ডিজিটাল বাজার এবং দপ্তিয়র ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।



