কক্সবাজারের মাতামুহুরি নদীতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরি ও পেকুয়া উপজেলায়। এই তিন উপজেলার ২৭ হাজার ৭৭৪টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে ও বন্যার পানিতে ডুবে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে।
গত আট দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের মাতামুহুরি নদীর পানি বৃদ্ধি পায় এবং বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকার ১৯ হাজার ২১২টি পরিবার ও পেকুয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ও একটি পৌরসভার আট হাজার ৫৬২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যার পানির প্রবল স্রোতে বসতবাড়ি, বেড়িবাঁধ, ব্রিজ-কালভার্ট, মৎস্য খামার, কৃষকের ফসলসহ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়। গত ১২ জুলাই বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এই ক্ষতচিহ্ন ভেসে উঠে।
উপজেলা প্রশাসনের বরাত দিয়ে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিরূপণ করেছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি (৯৫ শতাংশ) এলাকা প্লাবিত হয়েছে পেকুয়া উপজেলায়। মাতামুহুরি উপজেলার ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ, মহেশখালীর ৫০ শতাংশ ও রামুর ৩৫ শতাংশ প্লাবিত হয়েছিল।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ের টানা ভারী বর্ষণ ও বন্যায় জেলার ৪৫ হাজার ৪৩৬ পরিবারের দুই লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলায় বন্যার সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া উপজেলা। এ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১১ হাজার ২৩১টি পরিবারের প্রায় ৭৫ হাজার ৫০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একইসাথে নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের সাত হাজার ৯৮১টি পরিবারের ৪০ হাজার ২০০ জন ও পেকুয়া উপজেলার ৪৫ হাজার ৪৪৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
চকরিয়া উপজেলা (মাতামুহুরি উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব) নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, ‘পাহাড়ধসে ও পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। ইতোমধ্যে চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার বন্যার ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে।’
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, বন্যায় জেলার নয়টি উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নে তিন হাজার ৯১৮টি মৎস্য খামার ও ৪৫৩টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে এক হাজার ৯৭ মেট্রিক টন সাদা মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩৫৬ মেট্রিক টন মাছের পোনা ও দুই কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে।
এছাড়া বন্যায় জেলার ৬১টি ইউনিয়নের তিন হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়ির ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়গুলোর মোট আয়তন প্রায় দুই হাজার ৪৪০ হেক্টর। জেলা মৎস্য খাতে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, অতিবৃষ্টি ও বন্যায় আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানের বরজ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজিসহ চার হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়া উপজেলায় এক হাজার ৬৬১ হেক্টর ও পেকুয়া উপজেলায় ৫০০ হেক্টর জমি।
জেলায় মোট ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন, পেকুয়া উপজেলায় সাত হাজার ২০ জন কৃষক রয়েছেন।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানির তোড়ে পানি উন্নয়ন বিভাগ-১-এর আওতাধীন ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া উপজেলায়। উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: এ এম খালেকুজ্জামান বলেন, ‘বন্যায় জেলায় ৩০৩টি খামারের এক হাজার ২৯০টি গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৩৩০টি পোলট্রি খামারের ৯৭ হাজার ৫৮১টি হাঁস-মুরগিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিফতর (এলজিইডি) কর্তৃক জেলা প্রশাসনের জমা দেয়া হিসাব অনুযায়ী, কক্সবাজারে মোট দুই হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক ও ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরি ও পেকুয়া উপজেলায়। চকরিয়া উপজেলায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরিতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট এবং পেকুয়া উপজেলায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দু’টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর জানিয়েছে, বন্যায় কক্সবাজারে মোট ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায়। এই দুই উপজেলায় ১৫টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এম এ মান্নান বলেন, ‘জেলার সব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সব উপজেলা থেকে পাঠানো ক্ষয়ক্ষতির তালিকা নিরুপণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’



