মিয়ানমারের রাখাইনে আবারো সংঘর্ষ : মুহুর্মুহু বিকট শব্দে টেকনাফে আতঙ্ক

বুধবার রাতে রাখাইনের মংডু শহরে বিস্ফোরণের শব্দ বাংলাদেশের টেকনাফে পুরো সীমান্তজুড়ে শোনা যায়। এতে সীমান্তবর্তী জনপদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

গোলাম আজম খান, কক্সবাজার অফিস

Location :

Cox's Bazar
বাংলাদেশের কক্সবাজার সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে
বাংলাদেশের কক্সবাজার সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে |সংগৃহীত

প্রায় সাত মাস পর বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবারো বিদ্রোহীদের সাথে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী।

বুধবার রাতে রাখাইনের মংডু শহরে বিস্ফোরণের শব্দ বাংলাদেশের টেকনাফে পুরো সীমান্তজুড়ে শোনা যায়। এতে সীমান্তবর্তী জনপদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে মংডু ও বুছিডং শহরে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনী মর্টার শেল ও বিমান হামলা চালিয়েছে। সীমান্তের এপার থেকে ওপারের বিভিন্ন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানান, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার কিছু পরে পরপর চারটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় টেকনাফের জাদিমুরা থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পরপর বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

এলাকার একজন বাসিন্দা জানান, প্রথম বিস্ফোরণের সময় তার মনে হয়েছিল যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। এরপর পরপর চারটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন এবং নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের ভেতরে আগুনের শিখা দেখতে পান।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল ফয়েজ জানান, দীর্ঘদিন শান্ত থাকার পর গতরাত থেকে রাখাইনে আবারো আরাকান আর্মির সাথে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষ ও বিমান হামলা শুরু হয়েছে। এর প্রভাব সীমান্তের বাংলাদেশী জনপদেও অনুভূত হচ্ছে। বিস্ফোরণের শব্দে বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আনিক চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ টেকনাফ সীমান্তে শোনা গেছে। প্রশাসন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’

তিনি সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, প্রশাসনের কাছে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী রাখাইনের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

টেকনাফের জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক জানান, সীমান্তের ওইপাড় থেকে সকাল থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু শব্দ ভেসে এসেছে। রাত ৮টার পর থেকে আগুনের শিখা ও বেশ কয়েকটি বিকট শব্দ শোনা গেছে। এতে স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ বেড়েছে।

টেকনাফে আগে থেকে বসবাস করা এবং সার্বক্ষণিক রাখাইন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা একজন রোহিঙ্গা জানান, সকাল থেকে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে দফায় দফায় গোলাগুলির ঘটনা শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার পরে যুদ্ধবিমান থেকে বেশকিছু বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে সংবাদ পেয়েছি। হতাহতের ব্যাপারে জানা যায়নি। তবে এ ঘটনার জের ধরে বেশকিছু রোহিঙ্গা পরিবার অনুপ্রবেশের জন্য বাড়িঘর ছেড়ে সীমান্ত অভিমুখে জড়ো হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুক মান্নান জানান, ‘বহুদিন পর মিয়ানমারে আবারো সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিস্ফোরণের শব্দে মানুষের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। অনেকে আতঙ্কে ঘর থেকে বের হয়ে গেছেন।’

এ বিষয়ে বিজিবির কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের শব্দে সাময়িক উদ্বেগ তৈরি হলেও বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত আছে।’

সর্বশেষ গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের সময় মর্টার শেল বিস্ফোরণ ও ভারী গোলাগুলির শব্দ উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তজুড়ে শোনা গিয়েছিল। এরপর কয়েক মাস ধরে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান অভিযান অনেকটাই কমে গিয়েছিল। বুধবারের হামলার মধ্য দিয়ে আবারো সেই নীরবতা ভাঙল। ১৫ মিনিটের মধ্যে চারবার বিকট বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। প্রথমে মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। পরে বুঝতে পারি, সীমান্তের ওপার থেকেই বিস্ফোরণের শব্দ আসছে।