ময়মনসিংহে ডিজেল সঙ্কটে ধানকাটা কার্যক্রমে স্থবিরতা, বাড়ছে মজুরি

গত বছর প্রতি কাঠায় ৬০০ টাকা মজুরি নিলেও এবার তা বেড়ে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
ডিজেল সঙ্কটে ধানকাটা কার্যক্রমে স্থবিরতা
ডিজেল সঙ্কটে ধানকাটা কার্যক্রমে স্থবিরতা |নয়া দিগন্ত

ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলায় চাহিদা মাফিক জ্বালানি তেল না পাওয়ায় ধানকাটা ও মাড়াই কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় ডিজেল না পেয়ে কাজ করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন হারভেস্টার মেশিন ও মাড়াইকল মালিকরা। এতে একদিকে যেমন কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি বাড়তি মজুরির বোঝা গিয়ে পড়ছে কৃষকের ওপর।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে জানা যায়, পাম্প ও ডিলারদের কাছে পর্যাপ্ত ডিজেল না থাকায় হারভেস্টার ও মাড়াইকলের চালকরা প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তারা কৃষকের জমিতে ধানকাটা বা মাড়াই করতে রাজি হচ্ছেন না। কোথাও অল্প পরিমাণ তেল পাওয়া গেলেও গত বছরের তুলনায় বেশি মজুরি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

নান্দাইল উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে প্রায় ২২ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। ইতোমধ্যে নিচু ও কিছু উঁচু জমির ধানকাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু এ সময়েই জ্বালানি সঙ্কট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নান্দাইল চৌরাস্তার একটি ডিলার পয়েন্টে দেখা যায়, হারভেস্টার ও মাড়াইকলের চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না। অনেকেই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।

ডাংরী গ্রামের বাবুল মিয়া ও জাহাঙ্গীরপুর গ্রামের আব্দুল জব্বার জানান, তাদের প্রত্যেকের একটি করে মাড়াইকল রয়েছে। প্রতিদিন এসব মেশিন চালাতে ৩০ থেকে ৪০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও সারাদিন ঘুরে পাঁচ লিটারের বেশি ডিজেল জোগাড় করতে পারছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে তারা কাঠাপ্রতি মাড়াই খরচ ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা নিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, গত বছর মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে এক কাঠা ধানের বিনিময়ে মুখ সমান করে এক খাদি (পাইয়া) ধান নেয়া হলেও এবার তা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

গৌরীপুরের হারভেস্টার চালক মজনু মিয়া বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অল্প যা পাই, তা দিয়ে টুকটাক কাজ করছি। খরচ বেড়ে যাওয়ায় মজুরি বাড়াতে হচ্ছে।’

কৃষক আব্দুল করিম জানান, তার তিনটি হারভেস্টার রয়েছে। প্রতিটির জন্য দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু কয়েকদিনে মাত্র ৬০ লিটার জোগাড় করতে পেরেছেন, যা দিয়ে একটি মেশিন মাত্র দু’দিন চালানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরোদমে ধানকাটা শুরু হলে বড় বিপদে পড়তে হবে।’

তিনি জানান, গত বছর প্রতি কাঠায় ৬০০ টাকা মজুরি নিলেও এবার তা বেড়ে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তারাকান্দার বিসকা গ্রামের কৃষক আব্দুল বারেক জানান, তার কিছু জমির ধান ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। শ্রমিক দিয়ে ধান কাটলেও মাড়াইকল না পাওয়ায় বিপাকে পড়তে হয়েছে। পরে অনেক কষ্টে একটি মাড়াইকল পেলেও কাঠাপ্রতি আগের চেয়ে দুই থেকে আড়াই কেজি বেশি ধান দিতে হয়েছে।

ফুলবাড়িয়া এলাকার কৃষক নাজমুল হক বলেন, ‘প্রতি মণ ধানের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হলেও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে এক হাজার ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। তার ওপর মাড়াই খরচ বাড়ায় ধান চাষে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।’

হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, শম্ভুগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।

এ বিষয়ে বিভিন্ন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানায়, জ্বালানি সঙ্কটের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছে এবং সমাধানের চেষ্টা চলছে।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, ‘ধানকাটা ও মাড়াই কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কেউ ডিজেল না পেলে প্রশাসনকে জানাতে বলা হয়েছে।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ডিজেলের অজুহাতে অতিরিক্ত মজুরি নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।’