আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস আক্রমণ, ভীতি প্রদর্শন, নারীদের ওপর হামলা, সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর হুমকি, কালো টাকা বিতরণ এবং সাইবার হামলা করার অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) ১১ দলীয় জোট সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকালে তিনি এসব অভিযোগ করেন।
গোলাম পরোয়ার বলেন, ‘নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে থেকেই মাঠপর্যায়ে ভয়াবহ অনিয়ম ও সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।’
সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না ‘
নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গেলে নারী কর্মীদের বোরকা ও মুখের কাপড় টেনে খুলে নেয়া হচ্ছে। কোথাও প্রতিবাদ করলে তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে- এমনকি গর্ভবতী নারীর পেটে লাথি মারার অভিযোগ রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এ ধরনের কার্যক্রম করছে, তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে সেটা ভেবেই আমরা আতঙ্কিত ‘
সম্মেলনে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘খুলনা-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিলে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ হুমকি দেয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও মিটিং করতে গেলে তাদের জানিয়ে দেয়া হচ্ছে, দাঁড়িপাল্লার সভায় গেলে খবর আছে। অন্যদিকে কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাবেক নেতৃস্থানীয়দের জোরপূর্বক বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটা ভোট নয়, জোর করে রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা।’
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় তার নির্ধারিত সভা-সমাবেশে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেয়া হয়েছে। একাধিক স্থানে চেয়ার-টেবিল ভেঙে সভা ভণ্ডুল করা হচ্ছে। একটি এলাকায় গণসংযোগ শেষে নির্ধারিত সভাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রতিপক্ষের লোকজন গিয়ে চেয়ার সরিয়ে নেয় এবং সভা করতে বাধা দেয়। বিষয়টি থানাকে জানানো হলেও পুলিশ কাউকে আটক বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।’
ব্যাপকভাবে কালো টাকা বিতরণ ও ভোট কেনার অভিযোগ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘খুলনা-৫ আসনে সংগঠিতভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ঢালছে একটি পক্ষ। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক কোটা নির্ধারণ করে বাড়ি বাড়ি টাকা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, দিনমজুর, গরিব মানুষ, সংখ্যালঘু নারীদের ২০০-৩০০ টাকা করে দেয়া হচ্ছে। কেউ কেউ বিরিয়ানি আর নগদ টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। এটা নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন। কালো টাকার দাপটে রাজনীতি কলুষিত হচ্ছে এবং প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জামায়াত প্রার্থী বলেন, প্রত্যেক থানার কাছে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের তালিকা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কিংবা পরিচিত সহিংসদের গ্রেফতারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে তিনি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাইবার হামলার বিস্তারিত তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং পরবর্তীতে তার নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে।’ তদন্তে একটি সরকারি দফতরের একজন কর্মকর্তার ই-মেইল থেকে ভারতীয় উৎসের ভাইরাস ব্যবহার করে এই হ্যাকিং করা হয়েছে বলে তাদের সাইবার টিম শনাক্ত করেছে। এ ঘটনায় সাইবার আইনে মামলা করা হয়েছে এবং ডিবি পুলিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ল্যাপটপসহ আটক করে। এরপর ওই কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে মুক্তি দিতে পারেনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, খুলনা-৫ আসনে মোট ১৫০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৫২টি কেন্দ্রকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব কেন্দ্রে ভোটারদের ভয় দেখানো, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও আগাম ব্যালট সরানোর আশঙ্কা রয়েছে।ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর তালিকা প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মনিটরিং সংস্থার কাছে লিখিতভাবে দেয়া হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচিত হলে, এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, বন্ধ কলকারখানা আধুনিকায়ন করে চালু, যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, ফুলতলা ও ডুমুরিয়ায় স্টেডিয়াম নির্মাণ, সিকিরহাটে সেতু নির্মাণ, সব্জি চাষীদের সুবিধার্থে ডুমুরিয়ায় কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ এবং দৌলতপুর-শাহপুর দুইলেন বিশিষ্ট সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা আমির এমরান হুসাইন, সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মইনুল ইসলাম,সহকারী সেক্রেটারি মিয়া গোলাম কুদ্দুস, প্রিন্সিপাল গওসুল আজম হাদী, খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল খায়ের ও সাবেক যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেখ জাকিরুল ইসলাম।



