বাবার কাঁধে ভর করে এইচএসসি হলে জিন্নাত, হার মানেনি স্বপ্ন

মোটরসাইকেলে করে বাবার সাথে কেন্দ্রে এলেও পরীক্ষা ভবনে প্রবেশ করে বাবার কাঁধে ভর করে। তার সেই দৃশ্য পরীক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর আবেগের জন্ম দেয়।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
পরীক্ষার্থী জিন্নাত
পরীক্ষার্থী জিন্নাত |নয়া দিগন্ত

হাঁটতে পারে না। নিজের হাতে লিখতেও কষ্ট হয়। তবু জীবনযুদ্ধে থেমে থাকার মানুষ নয় আফিয়া জিন্নাত (১৭)। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই এবার এইচএসসি পরীক্ষার হলে পৌঁছেছে সে—বাবার কাঁধে চড়ে। দৃশ্যটি উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে ময়মনসিংহের গৌরীপুর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নেয় জিন্নাত। মোটরসাইকেলে করে বাবার সাথে কেন্দ্রে এলেও পরীক্ষা ভবনে প্রবেশ করে বাবার কাঁধে ভর করে। তার সেই দৃশ্য পরীক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর আবেগের জন্ম দেয়।

আফিয়া জিন্নাত উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের বাসিন্দা। বাবা মো: আব্দুল ওয়াদুদ ও মা মোছা: মুর্শিদা বেগমের মেয়ে সে। গৌরীপুর সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর আগে খলতবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে।

পরীক্ষা শেষে হল থেকে বেরিয়ে মুখে ছিল আত্মবিশ্বাসের হাসি। জিন্নাত বলে, ‘আমার অনেক স্বপ্ন। প্রতিবন্ধকতা আমাকে থামাতে পারবে না। নিজের যোগ্যতায় কিছু একটা করতেই চাই।’

মেয়ের স্বপ্ন পূরণে নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছেন মা মুর্শিদা বেগম। তিনি জানান, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীতের কুয়াশা—কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারেনি। প্রতিদিন হুইলচেয়ারে করে মেয়েকে কলেজে নিয়ে গেছেন। তার ভাষায়, ‘আমার মেয়ে কলেজে বা প্রাইভেটে একদিনও অনুপস্থিতি ছিল না। ওর ইচ্ছাশক্তিই আমাদের সাহস জুগিয়েছে।’

দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা বাবা আব্দুল ওয়াদুদও মেয়ের লড়াইয়ে সমানভাবে পাশে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হিসেবে অতিরিক্ত সময়ের অনুমোদন পেতেও অনেক চেষ্টা করতে হয়েছে। আমি শুধু চাই, আমার মেয়েটা এই সংগ্রামে জয়ী হোক। ওর অদম্য ইচ্ছাশক্তি আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। সবার কাছে দোয়া চাই।’

গৌরীপুর মহিলা কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব আবু সিদ্দিক জানান, বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী জিন্নাতের জন্য নিচতলায় আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত সময়েও পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

কেন্দ্র পরিদর্শক প্রভাষক কবীরুল আলম ও শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘পরীক্ষার পুরো সময়ই শিক্ষার্থীটির প্রতি বিশেষ নজর রাখা হয়েছিল। সে সুন্দরভাবেই পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।’

উপজেলা অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার কমল কুমার রায় জানান, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিনে গৌরীপুরে মোট এক হাজার ৬৬৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে এক হাজার ৬১৪ জন উপস্থিত ছিল। অনুপস্থিত ছিল ৫২ জন।

জিন্নাতের গল্প কেবল একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দেয়ার গল্প নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পারিবারিক ত্যাগ এবং স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাবার কাঁধে ভর করে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করা সেই কিশোরী যেন প্রমাণ করল—শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অদম্য মনোবল।