রংপুরের মিঠাপুকুরে গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশত ইটভাটা। যার মধ্যে ৩৩টি ভাটারই আবার নেই কোনো ছাড়পত্র। অর্ধশত ইটভাটার কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠেছে মিঠাপুকুরের বাতাস। ভাটাগুলোর কালো ধোঁয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বাস করছেন উপজেলার ছয় লক্ষাধিক মানুষ।
কেবল মিঠাপুকুর উপজেলার হিসাব ধরলেও প্রতি ২০ বর্গ কিলোমিটারে দাঁড়িয়ে আছে কমপক্ষে একটি ইটভাটা। অর্ধশতাধিক এই ইটভাটার প্রতিটির অবস্থানই আবার জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ও ফসলি জমির ওপর। নিয়মিত নজরদারি না থাকার সুযোগে যত্রতত্র গড়ে উঠছে ছোট-বড় আরো ইটভাটা।
মূলত কৃষিপ্রধান হলেও উত্তরাঞ্চলের বাতাসে আগের তুলনায় দূষণের মাত্রা বেড়েছে অনেক। শিল্পকারখানা না থাকলেও অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে মিঠাপুকুরের বাতাস। যার জন্য মূলত দায়ী ছড়িয়ে ছিটিয়ে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা। বায়ুমান সূচকে রংপুরের বায়ুদূষণ মাত্রা সম্প্রতি ২৭৪ পর্যন্ত উঠেছে। যেখানে বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্বোচ্চ দূষণের মাত্রা ৫০০।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবাদে প্রতিকার মেলে না। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আর পরিবেশ অধিদফতরের অজুহাত লোকবল সঙ্কট।
জানা গেছে, পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম-১০ ও পিএম-২ দশমিক ৫), নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনো অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড ও ওজোনসহ পাঁচটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে নির্ণয় করা হয় বায়ুমান। মান শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত থাকলে সেটিকে বলা হয় বিশুদ্ধ বায়ু। এরপর ৫১ থেকে ১০০ মোটামুটি, ১০১ থেকে ১৫০ সতর্কতামূলক, ১৫১ থেকে ২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১ থেকে ৫০০ পর্যন্ত বায়ুমানকে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রংপুরের মিঠাপুকুরে চলতি মাসে বায়ুমান নির্ণয় করা হয়েছে ২১৬।
এ ব্যাপারে রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, রংপুর বিভাগের আওতায় মিঠাপুকুরে কলকারখানা না থাকলেও বায়ুর দূষণমাত্রা অত্যন্ত বেশি। অগণিত ভাটার কারণে কৃষিপ্রধান এই উপজেলা ও জেলাগুলোতে দ্রুত আবহাওয়ার পরিবর্তন, তাপমাত্রা দ্রুত কমে যাওয়া কিংবা বেড়ে যাওয়া, তীব্র তাপদাহ, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টিসহ শীতকালে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার মতো ভয়ানক ঘটনা ঘটছে।
পরিবেশ অধিদফতরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র বলছে, বিভাগের আট জেলায় এক হাজার ১৮টি ইটভাটার মধ্যে শুধু ১৫১টি বৈধ। বাকি ৮৬৭টি ইটভাটা নিয়ম না মেনে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে রংপুর জেলাতেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি অবৈধ ইটভাটা। এ জেলায় ইটভাটা রয়েছে ২৪০টি। এরমধ্যে মাত্র ২৮টির রয়েছে ছাড়পত্র। বাকি ২১২টি ইটভাটার সঠিক কাগজপত্র নেই।
সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে ভাটাগুলোতে পোড়ানো হচ্ছে ইট, জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে কাঠ। আর ইট তৈরির অধিকাংশ মাটি ও বালু জোগান দিচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। এসব মাটি তোলা হচ্ছে উপজেলার নদ-নদী থেকে। এছাড়া ইট পোড়ানোর জন্য অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। আর এই কাঠের চাহিদা পূরণে সিন্ডিকেট গড়ে উজাড় করা হচ্ছে বনাঞ্চল। দিনের পর দিন প্রভাবশালীরা পরিবেশের ওপর তাদের এই নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এলেও নীরব সংশ্লিষ্টরা। অবৈধ ইটভাটার কালো ধোঁয়া আর ধূলিকণায় ভারী হয়ে আসছে বাতাস। তবুও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি। রাস্তাঘাটগুলো হয়ে উঠেছে ধূলিময়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কৃষকের তিন ফসলি এসব জমির ওপর জমছে আশপাশের ইটভাটা থেকে উড়ে আসা ক্ষতিকর ছাই-ধুলা। ভাটাগুলোতে কয়লার বদলে পোড়ানো কাঠের ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশ-বাতাসে। এছাড়াও আইনের তোয়াক্কা না করে দাপট খাটিয়ে নদ-নদীর শত শত স্পট থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বালু লুটছেন প্রভাবশালীরা। নদীপাড়ের ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে নদীর বুকে।
মিঠাপুকুর উপজেলার বড়বালা এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘যমুনেশ্বরী নদীর পাশের গ্রামেই আমার বাড়ি। নদীর পারে বেশকিছু জমিও আছে। প্রতিদিন নদীর বালু বিক্রি হয়। জমিতে বালুর আস্তর পড়ে আবাদ নষ্ট হয়। ভালো ফলন হয় না।’
এদিকে মারাত্মকভাবে বায়ুদূষণ বেড়ে যাওয়ার কারণে শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষেরই হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসার, মাতৃগর্ভে ভ্রূণের ক্ষতি, শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশ ব্যাহত হওয়াসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। দ্রুত এই বায়ুদূষণ কমানো না গেলে এখানকার নাগরিকরা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এসব বিষয়ে অভিযোগ দিলেও মিলছে না প্রতিকার। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে প্রশাসন।
মিঠাপুকুরের শুকুরের হাট ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, ‘সকালে বাসা থেকে বের হলেই ধুলাবালি আর ভারী বাতাসে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।’
মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা: রাশেবুল আলম জানান, রংপুরের মিঠাপুকুরে উন্নয়নমূলক কাজে সৃষ্ট ধুলাবালি, ইটভাটা ও কারখানা বায়ুদূষণের অন্যতম উৎস। এর ফলে সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও সিওপিডি রোগী বাড়ছে। সিওপিডিতে আক্রান্ত রোগীদের সারাজীবন ওই রোগে কষ্ট পেতে হচ্ছে। এর প্রতিকার জরুরি।


