ক্ষেতের পাকা ধান তলিয়ে গেছে। ধানের খলাতেও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। শুকানো ধান নষ্ট হয়েছে। ভেসে গেছে ধানের খড়; যা রয়ে গেছে, তাও বৃষ্টির পানিতে এখন পচে নষ্ট হচ্ছে।
শুক্রবার (১ মে) ভোররাতেও কিশোরগঞ্জের হাওরে বৃষ্টি হয়েছে। এতে নতুন করে কিছু হাওরের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শুক্রবার সকালে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম—এই তিন উপজেলার অন্তত ২ হাজার হেক্টর জমি নতুন করে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
চোখের সামনে জমির পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার এ দুঃসহ দৃশ্য দেখে সেখানে বুক চাপড়াচ্ছেন কৃষকরা। শুক্রবার সকালে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন।
“বৃষ্টি এইবার আগেই শুরু অইয়া গেছে, আমার পাঁচ কানি (৩৫ শতাংশে কানি) জমির ধান কাটতে পারছি না। সব পানির নিচে তল অইয়া গেছে। চার কানি জমির ধান কাইট্টা খলায় রাখছিলাম, এইগুলোও পানিতে পইচা গেছে।”
কথাগুলো বলছিলেন অষ্টগ্রাম হাওর এলাকার কৃষক বরজু মিয়া।
কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “ধান তো গেছে গেছেই, হাওরে কিছু খড় স্তূপ করে রাখছিলাম, বৃষ্টির পানিতে এইগুলোও ভেসে গেছে। সারা বছর আমাদের উপোস থাকতে হবে, গরুগুলোও না খেয়ে মরবে।”
অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের এই কৃষক জানান, সাধারণত বৈশাখের প্রথম সপ্তাহেই তারা বোরো ধান কেটে ফেলেন। কিন্তু এবার বৈশাখের শুরু থেকেই বৃষ্টি হওয়ায় জমি ভেজা থাকায় ধান পাকতে দেরি হয়। পরে ধান পাকলেও ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কৃষকেরা ধান কাটতে পারেননি। সেসব ধানই এখন পানির নিচে।
গত কয়েকদিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেও বিস্তীর্ণ বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এ সময় হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান। পহেলা বৈশাখ থেকে বৈশাখের শেষ পর্যন্ত এই এক মাস হাওরে বোরো ধান কাটা হয়। কিন্তু এবার ভারী বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা ধান কাটতে পারেননি।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো: শাহীনুল ইসলাম জানান, কিশোরগঞ্জের হাওরে শুক্রবার পর্যন্ত ৫৬ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধানের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ জেলায় বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, দুই-এক দিন বৃষ্টি না হলে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান ভেসে উঠবে এবং কৃষকেরা তা কাটতে পারবেন।
তবে একদিকে ধান কাটা নিয়ে সঙ্কট, অন্যদিকে আকাশে মেঘ থাকায় কাটা ধান শুকানো নিয়েও বিপত্তির কথা বলছেন কৃষকেরা। ফলে এখন দুই দিক থেকেই সঙ্কটে রয়েছেন তারা।
অষ্টগ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান যখন বৃষ্টিতে ধান তলিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন, তখন আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, কিশোরগঞ্জ জেলায় শনিবারও বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায়ও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, তবে এর তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির কারণে গতকাল কিশোরগঞ্জ জেলার সব নদ-নদীর পানির স্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।
অষ্টগ্রাম উপজেলার কৃষক আব্দুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “একে তো বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে ধান, তার ওপর রোদের দেখা না পাওয়ায় কেউ কাটলেও ধান শুকানোর কোনো উপায় নেই। ফলে এখন ধান কাটছেন না কেউ।”
মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামের কৃষক হারুন মিয়া বলেন, “যেসব জমির ধান তল অইয়া গেছে, এগুলোতে পানি কমলেও কাটন যাইতো না। শ্রমিক পাইয়াম কই? কাদা জমিতে হারভেস্টার মেশিন যায় না। এরপরেও এই ধান থাকলে কিছুই পাওয়া যাইত না। সব পইচা গেছে। ৬-৭ দিন পানির নিচে ধান থাকলে কি আর ভালো থাকবো?”
কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামের কৃষক হাবিল মিয়াও বোরো ধান নিয়ে নিজের দুর্দশার কথা জানান।
তিনি মোট ১১ কানি জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। বৃষ্টি শুরু হতেই তার আট কানি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। তিন কানি ক্ষেতের ধান কেটে মাড়াই করে খলায় রেখেছিলেন। খলায় পানি উঠে সেই ধানও তলিয়ে গেছে। হাওরে স্তূপ করে রাখা খড় পচে গেছে।
হতাশা প্রকাশ করে এই কৃষক বলেন, “যেগুলো পানির তলে গেছে, চাইছিলাম কাইট্টা আনতে। কিন্তু লোক লাগাইয়া খরচ কুলাইতে পারি নাই।”
এ অবস্থায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সাত জেলায় প্রায় ১১ হাজার ধান শুকানোর যন্ত্র (ড্রায়ার) বরাদ্দ করেছে।
ইটনার ধনপুর হাওরের কৃষক হেমন্ত কুমার দাস বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড তাগাদা দিতেছে হাওরের ধান কাইট্টা ঘরে আনার লাগি। কিন্তু পানিতে কেমনে ধান কাটাম? আর কাটলেও শুকায়াম কেমনে—ভালো কইরা তো সূর্যই ওঠে না।”
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর বোরো আবাদের শুরু থেকেই তারা নানা সংকটে ছিলেন। বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে, পর্যাপ্ত ডিজেলও পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি ব্রি-৮৮ ধানে মিশ্রণের অভিযোগও রয়েছে। বোরো ধান পাকার শুরুতে শিলাবৃষ্টি, এরপর কয়েক দফা অতিবৃষ্টি এবং সর্বশেষ ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চার দফায় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাদের।
মিঠামইন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো: ওবায়দুল ইসলাম খান অপু জানান, এবারের দুর্যোগের কারণে কৃষকদের চলার কষ্টের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। তার উপজেলায় ধানের সঙ্গে রাখা হাজার হাজার খড়ের স্তূপ পচে গেছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে এ জেলায় প্রায় ১৫ হাজার ৫৫৩ হেক্টর জমি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, “জেলার হাওরে ৬৭ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকিগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আমরা সবাই মাঠে রয়েছি।”
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: আমিরুল ইসলাম জানান, সেখানে ৭ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলায় ৫৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, “যেসব জমির ধান পানির নিচে গেছে, সেই পানি কমার সম্ভাবনা কম। কারণ নদীর পানি বাড়ছে। বৃষ্টি কিছুটা কমলেও আকাশ মেঘলা রয়েছে। তাছাড়া পাঁচ-সাত দিন পানির নিচে থাকায় ধান ইতোমধ্যে 'ডিকম্পোজ' হয়ে গেছে।”
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তিন মাসের সহায়তা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছায়, সে বিষয়ে তারা তৎপর।
তিনি বলেন, “হবিগঞ্জের হাওরে ৫ হাজার ৬২৩ হেক্টর জমির বোরো ধান পুরোপুরি এবং ৫ হাজার ৯১৫ হেক্টর জমির ধান আংশিক তলিয়ে গেছে।”
মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: জালাল উদ্দিন জানান, এ জেলায় দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৩২ হেক্টর জমি। এর মধ্যে ৯৪১ হেক্টর জমির বোরো ধান পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। তবে জেলায় ৮৩ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।
সিলেট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো: শামসুজ্জামান বলেন, “এ জেলায় ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম। মোট ৩০৮ হেক্টর জমির বোরো ধান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ ধান কাটা প্রায় শেষ। তবে বৃষ্টির কারণে মানুষ ধান শুকাতে পারছে না। ধানের খড় সব পচে যাচ্ছে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোস্তফা ইমরান হোসেন জানান, জেলায় ৩৭২ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশের মধ্যে ৫০ হেক্টর জমি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সাত জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৬৮৯ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে কৃষকরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি।



