বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, গণভোটে জনগণের প্রত্যক্ষ রায়কে পাশ কাটিয়ে বিএনপি সরকার দেশকে গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সঙ্কটে ঠেলে দিচ্ছে। জুলাই সনদের আড়ালে গণভোটের রায় অস্বীকার করা হচ্ছে, যা জনগণের ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে অবস্থান।
শনিবার (২ মে) খুলনা প্রেসক্লাবের ব্যাংকুয়েট হলে মহানগরী জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, সঙ্কটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মহানগরী আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাস্টার শফিকুল আলম ও জেলা আমির মাওলানা এমরান হুসাইন।
মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলমের পরিচালনায় সভায় অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপ-সচিব শ ম আবু তালিব, খুলনার সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর শামসুজ্জামান, অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রহমান, এনসিপির খুলনা মহানগরীর প্রধান সমন্বয়ক আহম্মদ হামীম রাহাত, খুলনা মহানগরী খেলাফত মজলিসের সভাপতি এফ এস হারুন অর রশীদ, সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন চঞ্চল ও ইসলামী ছাত্রশিবির খুলনা মহানগর সভাপতি রাকিব হাসান।
সভায় লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহ আলম।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার সচেতনভাবেই জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায় এই দুই বিষয়কে আলাদা করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। সরকার ও মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে বারবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও গণভোটে জনগণের দেয়া সরাসরি রায়ের বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখছে। একবারও কোনো মন্ত্রী বলেননি গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে মানা হবে। কারণ তারা জানে, সেটি মানলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব ভেঙে পড়বে।
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল প্রশ্ন তোলেন, গণভোটের আগে দীর্ঘ চার মাস সময় থাকা সত্ত্বেও বিএনপি বা সংশ্লিষ্টরা কেন কোনো আপত্তি তোলেনি। ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর, ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ, ২৫ নভেম্বর গণভোটের অধ্যাদেশ, ফেব্রুয়ারিতে ভোট এই পুরো সময়জুড়ে কেউ বলেননি এসব অসাংবিধানিক। অথচ ক্ষমতায় বসেই সবকিছু অবৈধ বলা হচ্ছে। এটি সুস্পষ্ট দ্বিচারিতা। সংবিধান সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, যা বাস্তবে সংস্কারের মূল কাঠামোকেই দুর্বল করে দেয়।
তিনি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেন, যেসব বিষয়ে বিএনপি আপত্তি তুলেছে, প্রধানমন্ত্রী একইসাথে দলপ্রধান থাকতে পারবেন না, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি মানতে অস্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা না মানা, বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীন কমিশনের বিরোধিতা, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, এই ১০টি জায়গা বাদ দিলে পুরো সংস্কারই অর্থহীন হয়ে যায়। সরকার আসলে সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। গণভোটে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে যে রায় এসেছে, সেটি সংসদের ডেলিগেটেড ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী। সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি তারা ডেলিগেটেড পাওয়ার এক্সারসাইজ করেন। কিন্তু গণভোটে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অস্বীকার করা মানে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা।
সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন। পার্লামেন্ট কখনোই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়। সরকারের বর্তমান অবস্থানকে তিনি কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনগণের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি গণতন্ত্র নয়, ফ্যাসিবাদের লক্ষণ।
তিনি সতর্ক করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে আবারো সংঘাত, অস্থিরতা ও রক্তপাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
জামায়াত নেতা বলেন, পার্লামেন্টে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের পথেই যেতে বাধ্য হতে হবে আমাদের। পাঁচ কোটি মানুষ যে রায় দিয়েছে, তা যদি সংসদে বাস্তবায়ন না হয়, আমরা আবার জনগণের কাছে ফিরে যাবো। তিনি সরকারকে সংসদে ফিরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তবে সতর্ক করে দেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, এখনো সুযোগ আছে সঙ্কট এড়াতে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান করা। অন্যথায় এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।



