সিলেট নগরের রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকায় প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও তাদের গৃহকর্মী তাহমিনাকে দিনেদুপুরে নৃশংস কায়দায় হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা কোতোয়ালি থানায় এ মামলা দায়ের করেন।
কোতোয়ালি থানার ওসি খান মোহাম্মদ মাঈনুল জাকির রাত সাড়ে ১২টায় নয়া দিগন্তকে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নগরের রিকাবিবাজারে শত কোটি টাকার জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে ভাড়াটে লোক দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে প্রেমের জেরে বাবুল আক্তার নামে এক যুবক এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে পুলিশের বক্তব্যকে কোনো আমলে নেয়া হয়নি।
বাবুল আক্তারকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কিন্তু মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি।
শুক্রবার থানায় উপস্থিত হয়ে সেলিনা সুলতানা অভিযোগ করেন যে, সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, মামলা প্রত্যাহারের হুমকি এবং সবশেষ পেশাদার ভাড়াটে খুনি দিয়ে তার বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়।
বাদির অভিযোগ, নগরের রায়নগর এলাকার সম্পত্তি ও রিকাবিবাজার এলাকায় লুসাই গির্জা সমিতির ভূমির মালিকানা নিয়ে তার বাবা আব্দুস সাত্তারের সাথে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের জেরে একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় মামলা প্রত্যাহারের জন্য সেলিনার বাবা ও তাকে হুমকি দেয়া হয়।
২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বিকেলে সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকজন তাদের পৈতৃক বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। এ সময় তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে তাদের দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়।
মামলায় আরো অভিযোগ করা হয়, ‘পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অত্যন্ত পেশাদার অজ্ঞাত ভাড়াটিয়া খুনিদের মাধ্যমে আমার বৃদ্ধ বাবা সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করে বাসা থেকে মামলা ও ভূমি সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলাদি নিয়ে যায়।’
থানায় অভিযোগ দেয়ার পর সেলিনা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আর আমার ভাই থানায় এসেছি। আমি বিশ্বাস করি না তিনজনকে একা একটা ছেলে হত্যা করেছে। এর পেছনে বড় কোনো হাত আছে। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, পরবর্তীতে যেন আর কোনো মা-বাবার এ রকম না হয়। ছেলের কাঁধে যেন আর কোনো মা-বাবার লাশ না ওঠে।’
ঘটনার দুই দিন পর শুক্রবার সকালে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন আব্দুস সাত্তারের ছেলে আরিফ ইফতেখার ও মেয়ে সেলিনা সুলতানা। এরপর তারা রাতে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন।
বাসার গৃহকর্মীর প্রেমের বিষয় নিয়ে সেলিনা বলেন, ‘কাজের মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার মা মারা গেছেন। একটা বাচ্চা মেয়ে, সে খুব ভালো ছিল, মেয়েটার কাছে কোনো মোবাইল ছিল না। মেয়েটা আমাদের কাছে আমানত ছিল। কেইসটা ঘুরানোর জন্য মেয়েটাকে দেখানো হচ্ছে। এটা সত্য কোনো ঘটনা না।’
ঘটনার পরদিন সন্ধ্যায় দম্পতিসহ তিনজনকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত বাবুল মিয়াকে (৪০) ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। পরে বিচারকের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেফতার বাবুলের বিষয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী আরিফ ইফতেখার বলেন, ‘আমরা ওয়েট করি, দেখি রিমান্ডে নেয়া হোক, তদন্ত হোক।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আপনারা সবাই জানেন, তিন দিন ধরে সিলেটে আলোচনা হচ্ছে। তদন্ত হোক। এ বিষয়ে পরে কথা বলব আপনার সাথে।’
শুক্রবার বাদ আসর নগরীর ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে নিহত দম্পতির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফিজ মাওলানা আসজাদ আহমদ।
জানাজার আগে নিহত দম্পতির ছেলে আরিফ ইফতেখার ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন।
হত্যার ঘটনায় গভীর নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘শান্তির নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেটে অতীতে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা খুব কমই ঘটেছে।’
এ হত্যাকাণ্ডের সাথে আরো কেউ জড়িত আছে কি-না, তা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানান সিসিক প্রশাসক। সেইসাথে দ্রুতবিচার আদালতের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তি করে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে রায়নগর এলাকায় মিতালী ১১১ নম্বর বাসার মালিক আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাদের কাজের মেয়ে তাহমিনার (১৮) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি রায়নগরে নিজের বাসায়ই থাকতেন।
এই দম্পতির চার সন্তারে মধ্যে দুই সন্তান লন্ডনে ও দুই সন্তান আমেরিকায় থাকেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বেলা ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা ও মরহুম নূর মিয়া ছেলে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা স্বীকার করেন।
ওই বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে প্রেমের জেরে তিনজনকে বাবুল হত্যা করে বলে জানায় পুলিশ। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটা ভোঁতা ও পুরনো ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ।


