ময়মনসিংহ অফিস ও মোহনগঞ্জ সংবাদদাতা
নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিফিন বিতরণ কার্যক্রমে ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। নির্ধারিত পুষ্টিকর খাবারের বদলে কখনো কাঁচা ডিম, কখনো শুধু রুটি—এমন অব্যবস্থাপনার মধ্যেই সামনে এসেছে আরো গুরুতর অভিযোগ—একজন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা ঠিকাদারি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়ে পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার ৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৩ হাজার ৩৫৭ শিক্ষার্থীর জন্য গত ২৯ মার্চ থেকে টিফিন বিতরণ শুরু হয়। নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে পাঁচ দিন শিক্ষার্থীদের রুটি, সিদ্ধ ডিম, দুধ ও মৌসুমি ফল দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
ঢাকার ‘সততা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হলেও মাঠপর্যায়ে এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো: ওলিউল্লাহ মোহনগঞ্জ এলাকায় ঠিকাদারের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে কার্যক্রম তদারকি করছেন। অর্থাৎ একজন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা সরাসরি ঠিকাদারি কার্যক্রমে জড়িত থেকে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব বিস্তার করছেন—যা সুস্পষ্টভাবে স্বার্থের সংঘাতের উদাহরণ।
বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শনে দেখা গেছে, নির্ধারিত খাবারের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে কাঁচা ডিম, কখনো আবার ডিম ও ফল ছাড়াই শুধু রুটি। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে খাবার পৌঁছাচ্ছে, ফলে বিতরণ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
মাইলোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খায়রুল ইসলাম জানান, ‘খাবার সময়মতো পৌঁছায় না। কখনো কাঁচা ডিম দেয়া হচ্ছে, যা সিডিউলের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।’
নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: মোস্তফা কামাল জিয়া বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে শুধু রুটি দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত মেন্যু মানা হচ্ছে না।’
গলগলি মল্লিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৌশিক তালুকদার জানান, নিম্নমানের খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ‘খাবার খেয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী বমি করেছে’ বলেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো: ওলিউল্লাহ দাবি করেন, তিনি ঠিকাদারের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি নন। তবে ‘পরিচিত হিসেবে’ তদারকি করছেন বলে স্বীকার করেন। তার এমন বক্তব্যই বরং প্রশ্নকে আরো জোরালো করেছে—কোনো ক্ষমতায় তিনি একটি ঠিকাদারি কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে তদারকির ভূমিকা পালন করছেন?
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আচরণবিধি অনুযায়ী কোনো ধরনের ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ এ ক্ষেত্রে সেই বিধি স্পষ্টভাবে উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, অনিয়মের বিষয়টি জানার পর ঠিকাদারকে সতর্ক করা হয়েছে এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, ‘ঠিকাদারকে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।’
তবে প্রশ্ন উঠেছে—শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পে এমন অনিয়ম ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কেন ঘটবে, এবং একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন?
সচেতন মহল বলছে, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের অনিয়ম আরো বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সাথে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।



