মানিকগঞ্জের কাঁচা মরিচ যাচ্ছে দুবাই-মালেশিয়া

উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন থেকে সন্ধ্যা নামতেই বাইসাইকেল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ঘোড়া ও মাথায় করে কাচাঁ মরিচের বস্তা নিয়ে শত শত কৃষক ছুটে আসে রঘুনাথপুর বাজারে। রাত ১২টা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা।

মো: শাহানুর ইসলাম, মানিকগঞ্জ

Location :

Manikganj
কাঁচা মরিচের হাট
কাঁচা মরিচের হাট |নয়া দিগন্ত

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার মহাদেবপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত রঘুনাথপুর বাজারে বসেছে কৃষকদের রাতের মেলা। এখানের কাঁচা মরিচ রফতানি হচ্ছে দুবাই-মালয়েশিয়া।

উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন থেকে সন্ধ্যা নামতেই বাইসাইকেল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ঘোড়া ও মাথায় করে কাচাঁমরিচের বস্তা নিয়ে শত শত কৃষক ছুটে আসে রঘুনাথপুর বাজারে। রাত ১২টা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা।

মানুষের সমাগম, হাকডাক, মুদি সদাইসহ কাচাঁ বাজার, চায়ের দোকানে আড্ডা, কৃষি শ্রমিক, কাজ মেটানোসহ নানান কাজে-কর্মে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে বাজার ও আশেপাশের এলাকা। বিগত পাঁচ বছার পূর্বে বর্তমান বাজার কমিটির সভাপতি ও মহাদেবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: শাহজাহানের নেতৃত্বে কৃষকদরে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বিক্রয়ের জন্যে এখানে রাতের এই বাজার ব্যবস্থা গড়ে উঠে। চার মাসের এই মরিচের মৌসুমে প্রায় ১৫ কোটি টাকার মরিচ বিক্রি হচ্ছে এ বাজারে। এ মরিচের একটি বড় অংশই হচ্ছে রফতানি। আয় হচ্ছে দেশের আর লাভবান হচ্ছে এলাকার কৃষকগণ।

এখন প্রতি দিন উপজেলার মহাদেবপুর, শিমুলিয়া, আরুয়া, শিবালয়, উথুলি, উলাইল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম হতে উৎপাদিত কাচাঁমরিচ সন্ধ্যার পর থেকেই এ বাজারে বিক্রি হয়।

বাজারের অন্যতম ব্যবসায়ী আ: রাজ্জাক বলেন, ‘গড়ে প্রতিদিন ২৫ টন কাচাঁমরিচ এখানে বিক্রয় হয়।এর মধ্য থেকে সাত-আট টন দুবাই, দুই-তিন টন মালেশিয়া সরাসরি এখান থেকে নিয়ে রফতানি করা হয়। কুয়েতেও মরিচ যাওয়া শুরু হয়েছিল কিন্তু যুদ্ধের কারনে বর্তমানে বন্ধ আছে। হয়তো খুব দ্রুতই চালু হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাস্তা ভাঙা ও সরু থাকার কারনে এবং টেপরী খালে ব্রিজ না থাকার কারনে আমাদের ছোট ছোট গাড়িতে বেশি ভাড়া দিয়ে মালামাল ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে নিতে হয়। পরে আবার গাড়ি পরিবর্তন করে মাল ঢাকায় পাঠাতে হয়। রাস্তা-ব্রিজ দ্রুত ভালো করা দরকার।’

মরিচ চাষি আব্দুর রউফ দেওয়ান বলেন, ‘মূলত কৃষিবিদ-১১০৬ মরিচটাই কারেন্ট মরিচ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এছাড়াও বিন্দু, কালো বিন্দু, মালেক সীডের সুপারহট, অস্থির-১, আগুন ইত্যাদি জাতও কারেন্ট হিসাবেই পরিচিত।’

তিনি বলেন, ‘গত বছর কৃষিবিদ-১১০৬ বীজ ঠিকমত অঙ্কুরিত না হওয়াতে কৃষকরা চরম লোকসানের

মুখে পড়েছিল কিন্তু আমরা সরকারি তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি।’

তিনি জানান, কৃষিবিদ-১১০৬ প্রতিকেজি ৭০ হাজার টাকা, মালেক সীডের সুপারহট এক লাখ ৪০ হাজার টাকা কেজি, আগুন প্রতি কেজি ৬০ হাজার টাকা এবং অস্থির-১ প্রতি কেজি বীজের দাম এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দাম।

মরিচ চাষি মো: জুয়েল হোসেন এরশাদ বলেন, ‘আমাদের উৎপাদন সব বছর এক রকম হয় না। এ বছর আশা করি দামও ভালো এবং উৎপাদনও ভালো তাই লাভ হবে ইনশাল্লাহ। এবার এক পাখি ( ২৭ শতাংশ) জমির মোট খরচ পড়বে প্রায় এক লাখ টাকা। রফতানি হবার কারনে আমাদের গড়ে পাখি প্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ হবে। তবে যদি সরকার থেকে ন্যায্য মূল্যে বীজ ব্যবস্থা করা হয়, সার-কীটনাশক ও মালচিং পদ্ধতির জিনিষপত্র কম দামে সরবরাহ করা হয় তাহলে কৃষকরা আরো উৎপাদনে আগ্রহী হবে।’

কৃষক মো: সেকেন্দার আলী বলেন, ‘আমাদের অন্য হাট-বাজারে গেলে অতিরিক্ত খাজনা আদায়, প্রতি মনে বেশি মরিচ দেয়া, পকেটমারের ভয়, বেপারিকর্তৃক মাল ক্রয়ের পরে বাকি রেখে হয়রানি করা ইত্যাদি সমস্যায় পড়তে হয়। কিন্তু এখানে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আশে পাশের কিছু লোকজন প্রথম প্রথম এ বাজার যাতে স্থায়ী না হয় সেই বিষয়ে চেষ্টা করেছিল কিন্তু কৃষি বিভাগসহ সাংবাদিকদের প্রকৃত লেখার মাধ্যমে কৃষকের এ বাজার টিকে গেছে। আমরা অনেক ভালো আছি।’

বাজার কমিটির সভাপতি ও মহাদেবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: শাহজাহান বলেন, ‘আমাদের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ পুরুষ-মহিলা সবাই সারা দিন কাজ করে রাতে উৎপাদিত পন্য নিয়ে বাজারে বিক্রি করে এতে তাদের সময় নষ্ট হয় না। দূরে মালামাল নেয়ার জন্যে বাড়তি ভাড়াও গুণতে হয় না। তবে রাস্তা-ব্রিজ গুলো দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন। যেখানে বিদেশি মুদ্রা আয় হচ্ছে এবং কৃষকদরে সুবিধা হচ্ছে যেখানে সরকারের সুনজর আশা করছি। একই সাথে বাজারের ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ দ্রুত কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে। এখানে কৃষকদের নিকট থেকে কোনো নির্দিষ্ট খাজনার নামে কোনো হয়রানি বা তোলার নামে পণ্য নেয়া হয় না। আমাদের পক্ষ হতে আগত কৃষকদের সব্বোর্চ নিরাপত্তা ও সহযোগিতা করা হচ্ছে।’

কলেজ শিক্ষক গোলাম মওলা বলেন, ‘কয়েক বছর আগে মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালাক এনায়েত উল্লাহ সাহেব যখন জানতে পারেন যে, গ্রামাঞ্চলের মানুষের উৎপাদিত মরিচ বিদেশে রফতানি হচ্ছে তখন তিনি নিজে এসে চেয়ারম্যানকে সাথে নিয়ে এই বাজারকে কৃষি বাজার হিসেবে ঘোষণা করনে। তখন থেকেই কৃষকরে এই বাজার বন্ধ করার জন্যে কিছু কুচক্রী মহলের যড়যন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়।’

মানিকগঞ্জ কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘আমরা এই রফতানিমুখি পণ্য উৎপাদনে ও বিপণনে আরো কিভাবে সহযোগিতা করা যায় তা খতিয়ে দেখছি। আমার কৃষকদের পাশে আছি এবং যাবতীয় সহযোগিতা করে যাব।’

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর বলেন, ‘কৃষি প্রধান এই অঞ্চলের কৃষকদরে প্রয়োজনে বর্তমান সরকার সবই করে যাচ্ছে এবং করে যাবে। কৃষি মালামাল পরিবহনে রাস্তা ও ব্রিজের যে সমস্যা আছে তা অবশ্যই সমাধান করা হবে।’