দৌলতপুরে চরাঞ্চল প্লাবিত, ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি

নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি দ্রুত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গো-খাদ্য সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন দুর্গতরা। একই সাথে সাপের উপদ্রব ও রোগব্যাধি মোকাবেলায় দ্রুত ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল টিম গঠনের দাবি তাদের। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থাকে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

Location :

Daulatpur

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা
পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। হু হু করে পানি বাড়ায় নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়িতে কোমরসমান পানি উঠেছে। ভিটেমাটি ছেড়ে পরিবার-পরিজন ও গৃহপালিত পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র ছুটছেন হাজারো মানুষ। উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হাইড্রোলজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বিকেল ৩টায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা ১৩ দশমিক ০৬ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। গত ২৪ ঘণ্টায় পানি ৭৪ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ফলে বিপৎসীমার মাত্র ৭৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

পাউবোর হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে পদ্মায় দ্রুত পানি বেড়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

আতঙ্কে ঘর ছাড়ছে মানুষ
বন্যার পানির স্রোতে নিম্নাঞ্চলের বেশ কিছু সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে চরাঞ্চলের মানুষ।

রামকৃষ্ণপুরের ৬৫ বছর বয়সী আবু বিশ্বাস বলেন, “ঘরের ভেতরে কোমর পর্যন্ত পানি। পরিবারের অন্যরা উঁচু জায়গায় গেলেও আমি মাচান বেঁধে কোনোমতে টিকে আছি।”

চর সোনাতলা এলাকার জুলেখা খাতুন বলেন, “রাস্তা ভেঙে বন্যার পানি বাড়ির মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রান্নাবান্না বন্ধ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খাওয়া-দাওয়া ও থাকা নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছি।”

একই এলাকার শ্যামল মণ্ডল বলেন, তার পাঁচ বিঘা জমির মরিচখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা ঘরে আটকা পড়েছেন। দিনে একবার রান্না করে তিনবার খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে সাপের উপদ্রবও বেড়েছে।

গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে খামারিরা
চরাঞ্চলের মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস কৃষি ও গবাদিপশু পালন। কিন্তু বন্যার পানিতে ফসলের পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। গো-খাদ্যের সঙ্কট ও পশু রাখার জায়গা না থাকায় অনেকে কম দামে গবাদিপশু বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।

বাহেরমাদিয়া চর গ্রামের মহিমা বেগম বলেন, “চারদিকে শুধু পানি আর পানি। গরুর থাকার জায়গা নেই, খাওয়ার ঘাসটুকুও পানিতে তলিয়ে গেছে। আশ্রয়ের জায়গা খুঁজতে গিয়ে উপায় না পেয়ে পোষা দুটি গরু অনেক কম দামে বিক্রি করে দিতে হয়েছে।”

১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ
বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় চরাঞ্চলের ১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

খারিজাথাক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু সুফিয়ান বলেন, শ্রেণিকক্ষে পানি উঠে যাওয়া এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে দাপ্তরিক কার্যক্রম চালু রয়েছে। পানি নেমে গেলে দ্রুত পাঠদান স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হবে।

বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সঙ্কট
বন্যার পানিতে নলকূপ ও রান্নার জায়গা তলিয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। একই সাথে সাপের উপদ্রব এবং পানিবাহিত রোগের আশঙ্কায় উদ্বেগে রয়েছেন বানভাসি মানুষ।

নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি দ্রুত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গো-খাদ্য সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন দুর্গতরা। একই সাথে সাপের উপদ্রব ও রোগব্যাধি মোকাবেলায় দ্রুত ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল টিম গঠনের দাবি তাদের। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংস্থাকে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।