রংপুরে চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনায় নিহত অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ও নিচে পানি পাওয়া গেছে। তবে বাসার ভেতরে কোনো পানির অস্তিত্ব মেলেনি।
ক্রাইম সিনের পাহারায় থাকা পুলিশ বলছে, লাইটের সুইচ অন করতে গিয়ে ভুলে মোটরের সুইচ অন হওয়ায় পানির ট্যাংক উপচিয়ে এসব পানি পড়েছে। তবে, গ্রেফতার সিদ্ধার্থের ভাই ও বাবার অভিযোগ, আলামত নষ্টের জন্য এটা করা হয়েছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) রাত ৯টায় নগরীর মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বাসার ছাদের বিভিন্ন অংশে পানি রয়েছে। ছাদের উঁচু স্থানে পানি না থাকলেও পুরো ছাদ ভেজা ছিল। এ সময় দেখা যায়, বাসার নিচে ছাদের পাইপ বেয়ে পানি পড়েছে। এতে বাসার প্রধান ফটকের সামনের একটি অংশে পানি জমে ছিল।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ টিম। সনাতন চক্রবর্তী গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে বাসার দরজা খোলেন। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, কোনো ঘরেই পানির অস্তিত্ব নেই। কোথাও পানির ছিটেফোঁটা নেই। ক্রাইম সিন যেভাবে রাখা হয়েছিল, সেভাবেই আছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন রকমের মন্তব্য করেছেন এ ঘটনায় গ্রেফতার আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়া সিদ্ধার্থ দাসের ভাই পার্থ দাস ও বাবা বিনয় দাস। এ সময় পার্থ দাসকে কাঁদতেও দেখা যায়।
পার্থ দাস বলেন, ‘আমরা বাড়ির সামনে আড্ডা মারছিলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হঠাৎ করেই বাড়ির পুলিশ পাহারাদার আশ্বিন দাদা গণপতি স্যারের বাড়ির ভেতরে গিয়ে সব লাইট অফ করে দিলো। অনেকক্ষণ পরে ছাদ থেকে পানি পড়তে থাকে। উপরে গিয়ে দেখি পুরো ছাদে পানি। বাসার নিচেও পানি জমতে থাকে।’
তার অভিযোগ, ‘মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত দেড়টার দিকে তিন-চারজন লোক নিহত গণপতির বাসায় ঢুকে রাত আড়াইটার দিকে বের হয়ে যায়। এর মধ্যে একজনের গায়ে লাল শার্ট ছিল। আমার নির্দোষ ভাইকে (সিদ্ধার্থ দাস) ফাঁসানোর জন্য জল (পানি) দিয়ে আলামত নষ্ট করলো প্রশাসন।’
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস বলেন, ‘আমি বসে আছি গণপতির বাড়ির সামনে। আমার ছেলে বলতেছে, বাবা কী ব্যাপার ওরা ভেতরে ঢুকে কিবা কাজটাজ করে আবার বের হয়ে চলে গেল। বাবা ওরা বিল্ডিংটা পানি দিয়ে ভাসিয়ে দিলো। এটা কি ওরা করতে পারে?’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা পাহারা দিচ্ছি, কেউ তো জানে না। আমরা প্রতিদিন বাপ-ছেলে মিলে বাড়িটা পাহারা দিচ্ছি। আমি এমনি একটা ভুল করছি, আমার সন্তানকে ধরে নিয়ে গেছে। সেটা তো আমি মেনে নিতে পারতেছি না। আরো যদি এরকম হয়...।’
বিনয় দাস আরো বলেন, ‘জল দিচ্ছে, এটা-সেটা দিচ্ছে, ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। আমি বললাম, বাবা তুমি একটা মিডিয়াতে খবর দাও। তারপর তো আপনারা আসলেন। এই যে জল-টল দিচ্ছে, এটা-সেটা করতেছে— এটা কি ওরা করতে পারবে? এটাতো পুলিশই আছে, পুলিশই দিচ্ছে।’
অন্যদিকে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য আশ্বিন কুমান বলেন, ‘আমি বাইরের লাইট অন করতে গিয়ে ভুল করে মোটরের লাইন অন করায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে পানির ট্যাংক উপচিয়ে পানি ছাদে এবং ছাদের পাইপ দিয়ে নিচে পড়েছে। টের পেয়ে আমি সুইচটা অফ করে দেই। ভেতরে কোনো পানি যায়নি। আমরা প্রথম ডিউটিতে, তাই কোথায় কোন সুইচ সেটা জানা ছিল না।’
এ ব্যাপারে রংপুর মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘বাড়িটিকে একটা ক্রাইম সিন হিসেবে প্রটেক্ট করা আছে। এখানে কোনো আলামত নাই। এই আলামতগুলো আমরা অলরেডি যেটা আমাদের প্রয়োজনীয় সেটা আমরা আমাদের হেফাজতে নিয়ে গেছি। সুতরাং এখানে এই পানি ঢেলে আলামত নষ্ট করার কোনো বিষয় নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আপনাদের মাধ্যমে শুনলাম যে, এখানে ছাদে নাকি পানি পড়েছে। তা আমরা দেখলাম, দেখে আমাদের এখানে যে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা আছে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম। তা তারা বললেন যে, এখানে ভুলবশত মোটরটা চালু করা হয়েছিল, তার ফলে উপরের যে ওভারহেড ট্যাংকটা আছে ওটা ওভারফ্লো করেছিল। পরে টের পাওয়ার পরে এটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেকারণেই কিছুটা পানি জমেছিল।‘
সিদ্ধার্থের ভাইয়ের অভিযোগ সম্পর্কে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘ভেতরের ক্রাইম সিন নষ্ট করা হয়েছে বা আলামত নষ্ট করা হয়েছে, এমন অভিযোগ পেয়ে আমরা আপনাদের গণমাধ্যমকর্মীদের কয়েকজন প্রতিনিধি নিয়ে উপরে যাই। যাওয়ার পরে যেটা দেখেছি সেটা আপনাদের ক্যামেরায় আছে। সেখানে এক ফোটা পানির অস্তিত্ব ছিল না। আমরা দেখলাম যে, গত পরশুদিন পরিদর্শনের সময় ক্রাইম সিন যেমন দেখে গেছি, এটা তেমনই আছে।’



